ভাবুন তো, আট বছর আগেও কতটা অচেনা ছিল ‘নারী-ভিত্তিক ব্যাংকিং’ শব্দদুটি! আর আজ? সেই শব্দগুলো হয়ে উঠেছে বাস্তবতা, হয়ে উঠেছে নারীর জীবনের নির্ভরতার নাম। এই যাত্রার পেছনে আছে এক সাহসী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন উদ্যোগ—ব্র্যাক ব্যাংকের ‘তারা’। ২০১৭ সালে যখন ‘তারা’ যাত্রা শুরু করে, তখন খুব কম মানুষই বুঝতে পেরেছিল এটি কতটা দরকারি হতে চলেছে। কিন্তু সময়ই দেখিয়েছে—এই প্ল্যাটফর্ম কতটা প্রভাব ফেলেছে দেশের লাখ লাখ নারীর জীবনে।
চট্টগ্রামের রাশেদা, একজন গৃহিণী, যিনি স্বামীর সামান্য ব্যবসায় সহায়তার জন্য একটি ছোট কারখানার কথা ভাবছিলেন। অথচ ব্যাংকিং ছিল তাঁর কাছে জাদুবিদ্যার মতো! তারপর ‘তারা’র মাধ্যমে একটি সহজ শর্তের সেভিংস অ্যাকাউন্ট খুলে, তিনি পেলেন লোন, পেলেন পরামর্শ, আর শুরু করলেন নিজের গার্মেন্ট পণ্যের ছোট্ট কারখানা। আজ রাশেদার কারখানায় ১৫ জন নারী কাজ করছেন। এমন হাজারো রাশেদা ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশে—তাদের প্রত্যেকের গল্পের পেছনে আছে ব্র্যাক ব্যাংকের ‘তারা’।
এই প্রজেক্ট শুরু হয়েছিল মাত্র ১৩% নারী গ্রাহক নিয়ে। তখনই বোঝা গিয়েছিল, সমস্যাটা শুধু লোন না পাওয়ার নয়, বরং ব্যাংকিং-জ্ঞান, আত্মবিশ্বাস আর সুযোগের অভাব। ঠিক সেই জায়গাগুলোতেই ‘তারা’ হাত দিয়েছিল। একে একে হাজির হলো ফ্লেক্সি ডিপিএস, গোল্ডেন বেনিফিট সেভিংস, সহজ শর্তের লোন, এবং এমন কিছু সুবিধা—যেগুলো শুধু নারীদের বাস্তব প্রয়োজন বুঝেই তৈরি।
তারা শুধু ব্যালেন্স শো করতেই নারীদের টাকা জমাতে বলেনি, বরং বিনা খরচে হেলথ ইনস্যুরেন্স দিয়েছে, মাতৃত্বকালীন কাভারেজ দিয়েছে, সিনিয়র নারীদের জন্য দিয়েছে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা। আর সবচেয়ে বড় কথা, কোনো বাড়তি ঝামেলা বা কাগজপত্র ছাড়াই লোনের সুবিধা—যা ছিল অনেক নারীর কাছে এক স্বপ্নের মতো।
তারা’র গ্রাহকদের বড় একটি অংশ হলো গৃহিণী, যাদের ব্যাংকের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না। এখন তাঁরা নিজেদের আয় রক্ষা করছেন, ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করছেন, এমনকি অনেকেই ব্যবসা শুরু করে ফেলেছেন। তাদের জন্য ব্র্যাক ব্যাংকের এই উদ্যোগ মানে শুধু টাকা নয়, বরং একটা নতুন পরিচয়—‘আমি পারি’।
তারা প্রোডাক্টের ডিজাইন এমনভাবে করা হয়েছে যাতে একজন নারী তাঁর নিজের জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে সেটি ব্যবহার করতে পারেন। ভার্চুয়াল ডেবিট কার্ড থেকে শুরু করে আস্থা অ্যাপ—সব কিছুই তৈরি হয়েছে নারী-সুবিধার কথা মাথায় রেখে। ইকেওয়াইসি, বিল পেমেন্ট, ফান্ড ম্যানেজমেন্ট—সব এখন হাতের মুঠোয়।
এদিকে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবাতেও তারা নারীদের প্রথম অভিজ্ঞতা দিয়েছে ব্যাংকিংয়ের জগতে। অনেকেই প্রথমবারের মতো একটি পাসবই হাতে পেয়েছেন, অ্যাকাউন্ট নম্বর জেনেছেন, বুঝেছেন কিভাবে সঞ্চয় করতে হয়। দেশের ২১% এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রাহক এখন নারী, আর এর পেছনে ‘তারা’র একটা বিশাল হাত রয়েছে।
ক্রেডিট কার্ড সেবাতেও তারা পিছিয়ে নেই। ভিসা প্ল্যাটিনাম থেকে মাস্টারকার্ড ওয়ার্ল্ড—সবকিছুতেই আছে নারীদের জন্য স্বচ্ছ, সহজ ও গ্রহণযোগ্য শর্ত। উচ্চ আয়ের নারীরা যেমন এই সেবাগুলোকে কাজে লাগাতে পারছেন, তেমনি সাধারণ নারী গ্রাহকরাও পাচ্ছেন সমান সুবিধা।
ব্যবসায়িক দিকটা বললে, ‘তারা উইমেন অন্ট্রপ্রেনর সেল’ বর্তমানে ৮৯,০০০ নারী উদ্যোক্তাকে সহায়তা দিয়ে চলেছে। তাঁদের জন্য দেওয়া ঋণের ৯৩%-ই জামানতবিহীন। ভাবুন তো, একজন নারী, যিনি নিজের পরিচয়েই ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন, কোনোকিছু বন্ধক না রেখেই! এসব উদ্যোগ শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ভাবেও নারীদের শক্ত ভিত গড়ে দিচ্ছে।
ব্র্যাক ব্যাংক মোট নারী এসএমই ঋণের ২৫% একাই দিয়ে যাচ্ছে। এনপিএল (খারাপ ঋণ) মাত্র ১.১%—যা প্রমাণ করে নারী উদ্যোক্তারা যতটা আন্তরিক, ততটাই দায়িত্ববান।
শুধু অর্থায়ন নয়, দক্ষতা গড়ার দিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে ‘তারা’। ‘উদ্যোক্তা ১০১’, ‘আমরাই তারা’, ‘উদ্যোগতারা ডিজিটাল ওয়ার্কশপ’—এসব প্রোগ্রামের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে, শাখায় এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কন্টেন্ট ক্রিয়েশন, বিজনেস ফটোগ্রাফি, ডিজিটাল মার্কেটিং—সব কিছুতেই মেয়েরা নিজেদের এগিয়ে নিচ্ছেন।
ফ্রিল্যান্সিং ট্রেনিংও রয়েছে। ১,৬০০-এরও বেশি নারী এখন ঘরে বসে অনলাইনে আয়ের পথ তৈরি করেছেন ‘স্বাবলম্বী তারা’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে। আবার ইআরপি সল্যুশন দেওয়া হয়েছে ১,২০০ জনেরও বেশি উদ্যোক্তাকে, যাতে তারা ব্যবসার হিসাব-নিকাশ সহজে রাখতে পারেন।
আরও চমকপ্রদ দিক হলো—‘তারা’ শুধু আর্থিক উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ নয়, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েও কাজ করছে। ‘মনের বন্ধু’র মাধ্যমে চালানো বিজনেস ডেভেলপমেন্ট সেশনগুলো নারীদের মানসিক সুস্থতা এবং আত্মবিশ্বাস বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ব্র্যাক ব্যাংক নিজের কর্মীদেরও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে যেন তারা নারীদের ব্যাঙ্কিং প্রয়োজন ভালোভাবে বুঝে, আরো সহজে, আরো সহানুভূতির সঙ্গে কাজ করতে পারে। আর এই সবের ফলেই, ২৬৩টি শাখা, ৪৪৬টি এসএমই ইউনিট অফিস ও ১,১২৩টি এজেন্ট আউটলেট নিয়ে ব্র্যাক ব্যাংক এখন দেশের প্রতিটি অঞ্চলে নারীদের পাশে।
বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতিও এসেছে। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যালায়েন্স ফর উইমেনের পাঁচটি পুরস্কার, গ্লোবাল এসএমই ফাইন্যান্স অ্যাওয়ার্ড, মাস্টারকার্ড এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ড, এসডিজি ব্র্যান্ড চ্যাম্পিয়ন—সবই প্রমাণ করে ‘তারা’ কেবল একটি ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং নারীর ক্ষমতায়নের এক বৈপ্লবিক নাম।
‘তারা’ আজ একটি প্রতীক—সেই সব নারীর, যারা নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়, স্বপ্ন দেখতে চায়, আর সেই স্বপ্নকে বাস্তব করতে চায় নিজের মতো করে। আর ব্র্যাক ব্যাংক ‘তারা’ হয়ে উঠেছে সেই সঙ্গী, যে নিরবে-নিভৃতে বলে—“তুমি পারবে!”
#নারীর_ক্ষমতায়ন #তারা_যাত্রা #ব্র্যাক_ব্যাংক #বাংলাদেশের_নারী #ব্যাংকিং_থেকে_স্বাবলম্বিতা