ভারতের বিহার রাজ্যের পুর্নিয়া জেলার তেতগামা গ্রামে ভয়াবহ কুসংস্কারচালিত এক হত্যাকাণ্ডে একই পরিবারের পাঁচজনকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার পেছনে রয়েছে ডাইনীবিদ্যা ও ওঝার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে উন্মত্ত জনতা।
গত ৬ জুলাই রাতে গ্রামে হঠাৎ চিৎকার, ঝাড়ফুঁক ও মন্ত্রোচ্চারণে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এরপর একদল মানুষ বাবুলাল ওরাঁওয়ের পরিবারকে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। পরিবারের পাঁচ সদস্যকে রশি দিয়ে বেঁধে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে হত্যা করা হয়।
নিহতরা হলেন—বাবুলাল ওরাঁও, তাঁর স্ত্রী সীতা দেবী, ছেলে মঞ্জিত, পুত্রবধূ রানি দেবী এবং ৭১ বছর বয়সী মা কাতো ওরাঁও। পরিবারটির একমাত্র জীবিত সদস্য কিশোর সন্তান কোনোভাবে পালিয়ে যায় এবং দূর থেকে এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে।
ঘটনার সূত্রপাত ১০ দিন আগে। এক শিশুর আকস্মিক মৃত্যু নিয়ে গ্রামে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। শিশুর বাবা রামদেব ওরাঁও স্থানীয় ওঝার পরামর্শে কাতো ও সীতাকে ডাইনি ঘোষণা করেন। এই ঘোষণার পরপরই উন্মত্ত জনতা তাঁদের আক্রমণ করে।
পুলিশের এফআইআরে বলা হয়, হামলাকারীরা লাঠি, রড ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে পাঁচজনকে অর্ধমৃত করে গ্রামে পুকুরপাড়ে নিয়ে যায় এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে তাঁদের পোড়া মরদেহ স্থানীয় পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয়।
তেতগামা গ্রামের অধিকাংশ মানুষ এখন এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে। গ্রামে নেমে এসেছে ভয়াবহ নীরবতা। অনেক ঘর তালাবদ্ধ, যেন তাড়াহুড়ো করে ফেলে যাওয়া হয়েছে। কেবল নিহতদের স্বজনরা সেখানে আছে।
পুলিশ এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে, যার মধ্যে ওঝাও রয়েছে। বাকি অভিযুক্তরা পলাতক। মামলায় গণপিটুনি, অপহরণ, হত্যা ও আলামত নষ্ট করার অভিযোগ আনা হয়েছে। পুলিশ ২০০ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত চালাচ্ছে।
নিহতদের পরিবারের বেঁচে থাকা সদস্যরা অন্য গ্রামে আত্মীয়দের কাছে আশ্রয় নিয়েছে। কিশোর ছেলেটিকে মানসিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে খাবার ও সুরক্ষা সহায়তা দিচ্ছে।
প্রশাসনের ভাষ্য, এলাকায় এর আগে কুসংস্কারজনিত কোনো হত্যার রেকর্ড নেই। তবে সমাজকর্মীরা বলছেন, স্থানীয় আদিবাসীরা এখনও চিকিৎসকের বদলে ওঝা-তান্ত্রিকের ওপর বেশি বিশ্বাস করে, যার ফলে এ ধরনের মব লিঞ্চিং ঘটছে।
একজন শিক্ষক জানান, গ্রামের শিশুরা স্কুলে যায় না, তারা কাজ করতে বাধ্য হয়। ফলে শিক্ষার অভাব কুসংস্কার বাড়িয়ে তুলছে। পঞ্চায়েত নেতার মতে, সচেতনতা বাড়াতে বিশেষ পদক্ষেপ জরুরি।
তেতগামার সেই রাতের ভয়াবহ স্মৃতি এখনো গ্রামবাসীদের তাড়া করছে। পুড়ে যাওয়া ঘর, ভাঙা আসবাব, আর ছড়িয়ে থাকা ছাই যেন সাক্ষী হয়ে রয়েছে এক ভয়াবহ বাস্তবতার।