মার্কিন সামরিক বাহিনী পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের সামরিক স্থাপনায় নির্ভুল বিমান হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, কৌশলগত হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার জবাবেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

শুক্রবার মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং উপকূলীয় রাডার স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়। সেন্টকম এক বিবৃতিতে বলেছে, আন্তর্জাতিক জলপথে চলাচলকারী ওই বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলাকে ‘কঠোর প্রতিক্রিয়া’ জানাতেই এই বিমান হামলা করা হয়।

এর আগে বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালীর কাছে সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী একটি কার্গো জাহাজে হামলা চালায় ইরান। ইরানের সংবাদমাধ্যম, সামরিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, প্রণালীতে ‘লঙ্ঘনকারী’ ওই জাহাজটিকে সতর্ক করতে কয়েক ঘণ্টা আগে গুলি চালানো হয়েছিল।

এই ঘটনার পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে দায়ী করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালীতে একটি কার্গো জাহাজে ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। তিনি একে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির ‘মূর্খতাপূর্ণ লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছেন।

ট্রাম্প জানান, একটি ড্রোন জাহাজের ওপরের ডেকে আঘাত হেনেছে এবং এতে জাহাজটির কিছু ক্ষতি হয়েছে। তবে জাহাজটি তার পথ চলা চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল এবং মার্কিন বাহিনী আরও তিনটি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে।

ট্রাম্পের ওই পোস্টে জাহাজটির নাম বা হামলার সঠিক সময় সম্পর্কে কিছু জানানো হয়নি। তবে যুক্তরাজ্যের সামরিক বাহিনী বৃহস্পতিবার জানিয়েছিল, ওমানের উপকূলে একটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এই মার্কিন হামলা এমন এক সূক্ষ্ম সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দীর্ঘদিনের সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। দুই দেশ বর্তমানে একটি অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করছে, যেখানে কৌশলগত এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল এবং ইরানের উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদের ভবিষ্যৎই প্রধান দুটি আলোচ্য বিষয়।

বর্তমান আলোচনার কাঠামো অনুযায়ী, চুক্তির চূড়ান্ত বিবরণ ঠিক করতে উভয় পক্ষকে ৬০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কোনো সমঝোতা না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।

হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, যার মধ্য দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে কোনো রকম অস্থিতিশীলতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

মার্কিন কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন, তারা ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধান চান, তবে প্রয়োজনে সামরিক বিকল্পও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। ইরানও তার শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর জোর দিয়ে আসছে এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।

সম্প্রতি উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সুরক্ষা দিতে মার্কিন নৌবহর ও আকাশপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তা সংস্থাগুলোও বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর প্রতি সতর্কতা জারি করেছে। তারা এই অঞ্চলে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের পরামর্শ দিয়েছে।

এই ঘটনায় বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাঁরা সব পক্ষকে সংযম দেখানোর এবং উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কারও পক্ষেই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কিন্তু উভয় পক্ষের সামরিক বাহিনী কাছাকাছি অবস্থান করায় ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা থেকেই যায়।

আগামী ৬০ দিন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই আলোচনার ফলাফলই উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা ঠিক করবে।

হোয়াইট হাউস বলেছে, তারা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং একটি ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী চুক্তির মাধ্যমে সংকট সমাধানে আশাবাদী।

Walton Ads