একটা সেমিনার হওয়ার কথা ছিল ভারতের রাজধানীতে। বক্তা তালিকায় নাম ছিল আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার। সব প্রস্তুতি শেষ, ঘোষণাও দেওয়া হয়ে গেছে আগে থেকে। কিন্তু অনুষ্ঠান শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে সব থেমে গেল। পুলিশ বলছে, তারা কিছুই করেনি। আয়োজকরা বলছেন, পুলিশই অনুমতি দেয়নি একদম শেষ মুহূর্তে। কে সত্যি বলছে? পুরো ঘটনাটা খুলে বলছি।

শনিবার, ঊনত্রিশে আগস্ট, দুই হাজার ছাব্বিশ সালের সন্ধ্যা। নয়াদিল্লিতে একটা সেমিনার-কাম-প্রেস কনফারেন্স হওয়ার কথা ছিল। নাম ছিল, ইউরোপ ও এশিয়া, সংলাপ থেকে অংশীদারত্বের দিকে। আয়োজক ছিল ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া, সংক্ষেপে এফসিসি।

অনুষ্ঠানটি হওয়ার কথা ছিল সন্ধ্যা ছয়টা থেকে সাড়ে আটটা পর্যন্ত। এফসিসি আগে থেকেই তাদের এক্স অ্যাকাউন্টে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল। সেখানে বক্তাদের নাম আর বিষয়বস্তুও উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু অনুষ্ঠান শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে খবর আসে, অনুমতি নেই।

এফসিসি তাদের সদস্যদের জানায়, দিল্লি পুলিশ অনুমতি দিচ্ছে না। তাই শেষ পর্যন্ত সেমিনারটি বাতিল করতে বাধ্য হন আয়োজকরা। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, এটি একটি অস্পষ্ট ও অব্যাখ্যায়িত হস্তক্ষেপ। এফসিসি বলেছে, এই সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

এখন প্রশ্ন হলো, পুলিশ কেন অনুমতি দিল না? এই বিষয়ে দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে। প্রথমত, এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানান একটি কথা। তিনি বলেন, অপ্রীতিকর পরিস্থিতির শঙ্কা থাকলে পুলিশ অনুষ্ঠান বাতিল করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, কিছু ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের কাছে একটি নথি পৌঁছায়। নথিটি ছিল তিলাক মার্গ থানার, এফসিসির আবেদনের ওপর হাতে লেখা। সেখানে লেখা ছিল, কিছু বিতর্কের কারণে অনুষ্ঠান অনুমোদিত নয়। এই নথিতে থানার সিলও ছিল, যা সিদ্ধান্তটি নিশ্চিত করে।

কিন্তু অন্যদিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলেছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। নয়াদিল্লির ডেপুটি কমিশনার শচীন শর্মা দ্য প্রিন্টকে জানান একটি বক্তব্য। তিনি বলেন, এফসিসির প্যানেল আলোচনার জন্য পুলিশের অনুমতির দরকার নেই। তিনি আরও বলেন, তাদের কোনো কর্মসূচিতে পুলিশ হস্তক্ষেপ করেনি।

তাহলে এফসিসি আর পুলিশের বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট একটা দ্বন্দ্ব আছে। এফসিসির সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ নন্দা আরেকটি তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পুলিশ তাদের জানিয়েছিল, ওপরতলা থেকে নির্দেশ আছে। এতে বোঝা যায়, সিদ্ধান্তটি হয়তো স্থানীয় থানার চেয়েও উঁচু পর্যায়ের।

এবার আসি, কারা এই সেমিনারে অংশ নিতেন তাদের কথায়। মূল আকর্ষণ ছিলেন আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক। তার নাম, ড. সেলিম মাহমুদ, বক্তা হিসেবে তালিকায় ছিলেন। বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান চলাকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, গণহত্যা ও রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে।

তাই দলটির কোনো নেতার আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থিতি স্পর্শকাতর একটি বিষয়। এফসিসির সভাপতি ওয়াইল আওয়াদ বলেছেন, অনুষ্ঠানটি ছিল পার্টনারশিপ নিয়ে। আয়োজকরা পরে পুলিশকে জানায়, সব বাংলাদেশি বক্তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবুও অনুমতি মেলেনি বলে দাবি করা হয়েছে কিছু প্রতিবেদনে।

এই পুরো ঘটনার একটা পটভূমিও আছে, যেটা জানা জরুরি। সাম্প্রতিক সময়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা একটি ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন করেন। সেটি নিয়ে বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল। সেই সংবাদ সম্মেলনও এফসিসিই আয়োজন করেছিল আগে একবার।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার আর দ্য প্রিন্ট একটি বিষয় লিখেছে। তারা বলছে, পুলিশ নতুন বিতর্ক এড়াতেই এই সেমিনারটি বন্ধ করেছে। এফসিসির সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ নন্দা একটি প্রশ্ন তুলেছেন সরাসরি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা নেতাদের ভিসা তো দেওয়া হয়েছিল।

তাহলে ভিসা দিয়েও কেন অনুষ্ঠান করতে দেওয়া হলো না, সেটাই তার প্রশ্ন। বর্তমানে সেমিনারটি বাতিলই আছে, আর এফসিসি সেটি নিশ্চিত করেছে। পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এখনো আসেনি। বাংলাদেশ সরকারের প্রতিক্রিয়াও এই মুহূর্তে স্পষ্ট নয়।

এফসিসি ও দিল্লি পুলিশের বক্তব্যের মধ্যে দ্বন্দ্ব এখনো রয়ে গেছে। একদিকে থানার নথি, অন্যদিকে ডিসিপির অস্বীকৃতি, দুটোই সামনে আছে। বাংলাদেশ আর ভারতের সংবাদমাধ্যমেও ঘটনাটি ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান প্রেক্ষাপটেই এই ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

Walton Ads