মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তার মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন কৌশলগত শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে ব্রাজিল। বিশেষ করে চীন ও ভারত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এখন ঝুঁকছে ব্রাজিলের অপরিশোধিত তেলের দিকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক সুবিধাভোগীদের মধ্যে অন্যতম এখন ব্রাজিল।
মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাব, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং ইরানি বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ অবরোধ—সব মিলিয়ে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে বড় ধরনের চাপ। একই সঙ্গে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার তেল সরবরাহও সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলো এখন বিকল্প ও তুলনামূলক নিরাপদ উৎস খুঁজছে।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যতম বড় তেল রফতানিকারক দেশ ব্রাজিলের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। জ্বালানি বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলারের বিশেষজ্ঞ সুমিত রিতোলিয়া কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, “ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে এশিয়ার জন্য ব্রাজিলের গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে।”
কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এশিয়ার দেশগুলো ব্রাজিল থেকে দৈনিক প্রায় ১২ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করতো। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ লাখ ব্যারেলে। বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর নির্ভরতা কমাতে এখন কৌশলগতভাবে ব্রাজিলকে গুরুত্ব দিচ্ছে এশিয়ার দেশগুলো।
এরই মধ্যে উৎপাদনও বাড়িয়েছে ব্রাজিল। ২০২৫ সালে দেশটি দৈনিক প্রায় ৩৭ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন করলেও চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে তা বেড়ে গড়ে ৪০ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে। মে মাসে উৎপাদন দাঁড়ায় প্রায় ৪১ লাখ ১০ হাজার ব্যারেলে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি যুদ্ধের কারণে হঠাৎ উৎপাদন বৃদ্ধি নয়। সুমিত রিতোলিয়ার ভাষায়, “চলতি বছরের মার্চের পর থেকে ব্রাজিলের উৎপাদন মাত্র ৫০ হাজার থেকে এক লাখ ব্যারেল বেড়েছে। অর্থাৎ বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় দ্রুত সরবরাহ বাড়ানোর সক্ষমতা তাদের সীমিত।”
বর্তমানে ব্রাজিলের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পেট্রোব্রাস এশিয়ার বাজারে রফতানি বাড়াচ্ছে। কারণ উপসাগরীয় ঝুঁকি এড়িয়ে তুলনামূলক নিরাপদ উৎস থেকে তেল কিনতে এখন বেশি দাম দিতেও প্রস্তুত এশীয় ক্রেতারা। পেট্রোব্রাসের ৬০ শতাংশের বেশি রফতানি এখন যাচ্ছে চীনে।
চীন বর্তমানে ব্রাজিলিয়ান তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত দেশটি দৈনিক গড়ে প্রায় ১৩ লাখ ১৬ হাজার ব্যারেল ব্রাজিলিয়ান তেল আমদানি করেছে। অন্যদিকে ভারতও আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। প্রথম পাঁচ মাসে ভারত দৈনিক গড়ে প্রায় দুই লাখ ৩৮ হাজার ব্যারেল ব্রাজিলিয়ান তেল আমদানি করেছে। এপ্রিল মাসে ব্রাজিল ভারতের চতুর্থ বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রাজিলের ‘মিডিয়াম-সুইট’ ধরনের অপরিশোধিত তেলে সালফারের পরিমাণ কম হওয়ায় এটি সহজে ডিজেল ও জেট ফুয়েলে রূপান্তর করা যায়। ফলে এশিয়ার শোধনাগারগুলোর কাছে এই তেলের চাহিদা বাড়ছে।
তবে সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ব্রাজিল থেকে চীনে তেল পৌঁছাতে প্রায় ৫০ দিন সময় লাগে, যা পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া আর্কটিক রুট চালু হলে রাশিয়াও আবার এশিয়ার বাজারে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংকটকালে ব্রাজিল গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হলেও দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যের স্থায়ী বিকল্প হয়ে ওঠা দেশটির জন্য সহজ হবে না।
