বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন থেকে: তারেক রহমানের পর এখন তার মেয়ে জাইমা রহমান বিএনপিতে বিশেষ নজর কাড়ছেন। দলের পক্ষ থেকে তাকে ধীরে ধীরে সামনে আনা হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক।

দলের কোনো পদ না থাকলেও, পরিবারের সঙ্গে দেশে ফেরার পর থেকেই জাইমা রহমানের কার্যক্রম নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে আগ্রহ আর কৌতূহল তৈরি হয়েছে। যদিও এখনো খুব সীমিত কয়েকটা অনুষ্ঠানেই যোগ দিয়েছেন তিনি।
অনেকের ধারণা, জাইমাকে সামনে এনে বিএনপি নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার বার্তা দিচ্ছে। ভবিষ্যতে তিনি দলের নেতৃত্বে আসতে পারেন—এমন চিন্তা করেই তাকে প্রস্তুত করা হচ্ছে।

আবার কেউ কেউ বলছেন, আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে মাথায় রেখে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা জাইমাকে বিভিন্নভাবে সামনে আনছেন। এর মাধ্যমে তরুণ আর নারী ভোটারদের আকর্ষণ করার চেষ্টা থাকতে পারে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণ প্রজন্মকে টার্গেট করে জাইমা রহমানকে তুলে ধরা হচ্ছে বলে মনে করেন কিছু বিশ্লেষক।

আরেকটা আলোচনা হচ্ছে—জামায়াতে ইসলামীকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে বিএনপি নারীদের কীভাবে উপস্থাপন করতে চায়, তার একটা ছবি জাইমা রহমানের মাধ্যমে দেখানো হচ্ছে।

যদিও এবারের নির্বাচনী প্রচারে তারেক রহমানের সঙ্গে তার স্ত্রী জুবাইদা রহমানকে কয়েক জায়গায় দেখা গেছে, কিন্তু জাইমা এখনো কোনো নির্বাচনী মঞ্চে ওঠেননি।
জাইমা রহমান সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নাতনি হিসেবে দলীয় কর্মী-সমর্থক থেকে সাধারণ মানুষ—সবার মধ্যেই তার প্রতি আগ্রহ আছে। কিন্তু বিএনপি বা পরিবারের পক্ষ থেকে তার সম্পর্কে কখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

দলীয় সূত্র অনুযায়ী, জাইমা রহমান ১৯৯৫ সালের অক্টোবরে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষা শুরু হয় ঢাকার বারিধারায় একটা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে। পরে লন্ডনে গিয়ে ম্যারি মাউন্ট গার্লস স্কুল, তারপর কুইন ম্যারি ইউনিভার্সিটিতে আইন পড়েন। পরে ইনার টেম্পল থেকে বার-অ্যাট-ল সম্পন্ন করেন।
গত ২৩ ডিসেম্বর নিজের ফেসবুক পেজে একটা লেখায় তিনি আইন পেশায় কাজ করার ইঙ্গিত দেন। লিখেছেন, "আইন পেশায় কাজ করার সময় কাছ থেকে দেখা মানুষগুলোর গল্প, আর সেই গল্পগুলোর যৌক্তিক এবং আইনগত সমাধান খোঁজার দায়িত্ব আমাকে আলোড়িত করে"।

২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে তারেক রহমান সপরিবারে লন্ডন চলে যান। ১৭ বছর পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় ফেরেন।
দেশে ফেরার আগে জাইমা সামাজিক মাধ্যমে খুব সক্রিয় ছিলেন না। তার বাবা সক্রিয় থাকলেও জাইমার উপস্থিতি চোখে পড়েনি। তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ তৈরি হয়েছে গত বছরের ২৪ নভেম্বর। সেখানে নিজেকে 'ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল, কমিউনিকেশনস স্ট্রাটেজিস্ট এবং কর্পোরেট ল'ইয়ার' বলে পরিচয় দিয়েছেন।

পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংবাদমাধ্যম তার অনুষ্ঠান ও পোস্টগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রচার করছে। দলের ভেরিফায়েড পেজ থেকেও তার কার্যক্রম প্রচার হচ্ছে, আর তিনি নিজেও শেয়ার করছেন।

দলীয় কার্যক্রমে জাইমার সম্পৃক্ততা
আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে কোনো পদ নেই তার। কিন্তু গত বছরের নভেম্বরে প্রবাসীদের নিয়ে একটা ভার্চুয়াল সভায় যোগ দিয়ে আলোচনায় আসেন। সভায় ইউরোপের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রবাসী ভোটারদের বিষয়ে আলোচনা হয়।
সভার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে জাইমাকে ধন্যবাদ জানাতে দেখা যায়।

এর আগে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তার বাবার প্রতিনিধি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্টে যোগ দেন। সেখানে মির্জা ফখরুল ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে ছিলেন।

দেশে ফেরার আগে ২৩ ডিসেম্বর ফেসবুকে 'নিজের গল্প' শেয়ার করে লেখেন, "চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় এবং পাঁচই অগাস্টের আগে-পরের সময়টাতে আমি যতটুকু পেরেছি, নেপথ্যে থেকে সাধ্যমতো ভূমিকা রাখার চেষ্টা করেছি"।

"দেশে ফিরে ইনশাআল্লাহ, আমি 'দাদু'র পাশে থাকতে চাই। এই সময়টাতে আব্বুকে সর্বাত্মক সহায়তা করতে চাই। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে দেশের জন্য সর্বস্ব দিয়ে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে চাই"।
তার দাদি খালেদা জিয়া গত ৩০ ডিসেম্বর হাসপাতালে মারা যান।

দেশে ফিরে ১৮ জানুয়ারি 'উইমেন শেপিং দ্য নেশন: পলিসি, পসিবিলিটি অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব বাংলাদেশ' অনুষ্ঠানে প্রথমবার বক্তব্য দেন ও প্রশ্নোত্তরে অংশ নেন। সেখানে বলেন, এটাই তার এ ধরনের প্রথম অনুষ্ঠান।
২৫ জানুয়ারি বিএনপির 'আমার ভাবনায় বাংলাদেশ' রিল-মেকিং প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের সঙ্গে তারেক রহমানের আলাপ অনুষ্ঠানে যোগ দেন। গুলশানের একটা পার্কে হয় অনুষ্ঠানটি।

সবশেষ ২৭ জানুয়ারি দৃক গ্যালারিতে আলোকচিত্র প্রদর্শনী দেখতে যান এবং ফেসবুকে ছবি শেয়ার করেন।
বিশ্লেষকরা যা বলছেন
জাইমা রহমানকে নিয়ে আলোচনায় উপমহাদেশের রাজনীতিতে পরিবারতন্ত্রের কথা উঠে আসছে। বাংলাদেশে বিএনপি ও আওয়ামী লীগে দীর্ঘদিন ধরে পরিবারই নেতৃত্বে প্রাধান্য পেয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ভারতে নেহেরু ইন্দিরা গান্ধীকে রাজনীতিতে এনেছিলেন, পাকিস্তানেও পারিবারিক রাজনীতির ইতিহাস আছে। "বিএনপির সমর্থকরা এ পরিবারকে ঘিরেই রাজনীতি করেন, তাই জাইমাকে গ্রুমিং করা হচ্ছে। জনমনে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতার ধারণা দেওয়া হচ্ছে।"

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে তরুণ, নারী ও জেন-জি প্রজন্মকে আকর্ষণ করতেই জাইমাকে সামনে আনা হচ্ছে। "এতে নেতৃত্বের দিকনির্দেশনা আছে। ধর্মান্ধতার উল্টো দিকে নারীদের উপস্থাপন করতে চায় বিএনপি।"
"সময়ই বলবে তিনি নেতা হিসেবে কতটা প্রস্তুত হন," যোগ করেন তিনি।

 

Walton Ads