ঢাকা: বৃহস্পতিবারের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বড় বার্তা দিলেন বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান। জার্মানির আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, ভোট শেষে বিএনপি এককভাবে সরকার গঠনে সক্ষম হবে বলেই তারা আশা করছেন। সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে নারীর ক্ষমতায়ন, ভারত-চীন সম্পর্ক, গুম-খুনের বিচার, তরুণ ভোটার এবং নির্বাচন ঘিরে নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
১৭ বছরের নির্বাসন, মায়ের মৃত্যু আর নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ
১৭ বছর পর দেশে ফেরা—তার ওপর নির্বাচনের প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে সময়টা সহজ ছিল না বলে জানান তারেক রহমান। দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় মা বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু তার জন্য ব্যক্তিগতভাবে বড় ধাক্কা ছিল।
তিনি বলেন, একদিকে নির্বাচনের ডামাডোল, অন্যদিকে পারিবারিক শোক—এই দুই পরিস্থিতি সামলে এগোনোটাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি মনে করেন, পরিস্থিতি তিনি মোটামুটি সামাল দিতে পেরেছেন।
নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে?
১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট। নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে—এমন প্রশ্নে তারেক রহমানের জবাব, তারা সুষ্ঠু নির্বাচন প্রত্যাশা করছেন। শুধু দল নয়, সাধারণ মানুষও সুষ্ঠু ভোট চান বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তরুণ ভোটারদের জন্য কী পরিকল্পনা?
এবারের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক তরুণ প্রথমবার ভোট দেবেন। গত তিনটি নির্বাচন বিতর্কিত হওয়ায় মানুষের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
তরুণদের আকৃষ্ট করতে আলাদা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নে তারেক রহমান বলেন, তাদের ঘোষিত ইশতেহারে তরুণ, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও নারী—সব শ্রেণির মানুষের জন্য পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশ গড়তে হলে সবাইকে নিয়েই এগোতে হবে। শুধু তরুণ নয়, পুরো সমাজের উন্নয়নকে সামনে রেখেই কর্মসূচি সাজানো হয়েছে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক—দূরত্ব থাকবে নাকি নতুন অধ্যায়?
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। অতীতে ভারতের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব ছিল—এমন মন্তব্যের জবাবে তারেক রহমান বলেন, যদি কোনো চুক্তি বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী হয়, তাহলে যে কোনো দেশের সঙ্গেই দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
তার ভাষায়, তিনি দেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাই দেশের স্বার্থ সবার আগে।
চীনের বাড়তি আগ্রহ—বিএনপির অবস্থান কী?
ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চীনের আগ্রহ বাড়ছে বাংলাদেশে। এ বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, বর্তমান বিশ্ব ‘গ্লোবাল ভিলেজ’। একা থাকা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের স্বার্থ বজায় থাকলে যে কোনো দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান—সবই দেশের মানুষের কল্যাণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।
জামায়াতের সঙ্গে জোট সরকার?
বিএনপি কি জামায়াতের সঙ্গে ঐক্যের সরকার করবে? তারেক রহমান স্পষ্ট বলেন, তারা আত্মবিশ্বাসী—বাংলাদেশের মানুষের রায় পেলে এককভাবেই সরকার গঠন করতে পারবেন।
তার মতে, একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রের জন্য শক্তিশালী বিরোধী দলও প্রয়োজন। সবাই সরকারে থাকলে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য থাকবে না।
নারীর ক্ষমতায়ন—কথায় নয়, পরিকল্পনায়
দেশে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের অর্ধেক নারী। কিন্তু প্রার্থী তালিকায় নারীর সংখ্যা কম। এ বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন শুধু কিছু আসনে মনোনয়ন দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বেগম খালেদা জিয়া মেয়েদের ক্লাস ওয়ান থেকে টুয়েলভ পর্যন্ত শিক্ষা ফ্রি করেছিলেন। ভবিষ্যতে সরকার গঠন করতে পারলে এই সুযোগ আরও উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বাড়ানো হবে।
এছাড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী দিয়ে শুরু করে গৃহিণীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলেন তিনি, যার মাধ্যমে সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে। এতে নারীরা মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হবেন বলে দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন, নারীদের কর্মসংস্থানে শিল্পায়ন বাড়ানো, কেয়ার সেন্টার নিশ্চিত করা এবং বড় শহরগুলোতে শুধু নারীদের জন্য ইলেকট্রিক বাস চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে—যেগুলো নারীরাই পরিচালনা করবেন।
নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে বার্তা
১২ তারিখের পর নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ আছে—এমন প্রশ্নে তারেক রহমান বলেন, এসব ধারণা কিছু রাজনৈতিক দলের বক্তব্য থেকে তৈরি হয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, নারীদের বাদ দিয়ে দেশ এগোতে পারে না। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও নিরাপদ যাতায়াত—এই তিন দিকেই তারা কাজ করবেন।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ—নির্বাচন কি অংশগ্রহণমূলক?
সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না। এতে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে না—এমন মতের জবাবে তারেক রহমান বলেন, রাজনীতি মানুষের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল।
তার মতে, মানুষ যাকে গ্রহণ করবে, তাকে কেউ আটকাতে পারবে না। আর যাকে মানুষ গ্রহণ করবে না, শক্তি দিয়ে টিকে থাকা সম্ভব নয়—৫ আগস্ট তার উদাহরণ।
দুর্নীতি বনাম ঋণখেলাপি ইস্যু
বিএনপির কিছু প্রার্থী ঋণখেলাপি—এমন অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তারেক রহমান বলেন, দুর্নীতি ও ঋণখেলাপি এক বিষয় নয়।
তার দাবি, বিগত সরকারের আমলে বিএনপির বহু নেতাকর্মী হয়রানির শিকার হয়েছেন। ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা, ব্যাংক ঋণ না দেওয়া—এসব কারণে অনেকে ডিফল্ট হয়েছেন। এটি দুর্নীতির সমান নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
গুম-খুনের বিচার হবে?
গত ১৫-১৬ বছরে গুম-খুনের অভিযোগে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য কী পরিকল্পনা—এ প্রশ্নে তারেক রহমান বলেন, অবশ্যই বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু বিএনপি নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষও গুম-খুনের শিকার হয়েছেন। একটি সভ্য দেশে বিচারহীনতা চলতে পারে না। দেশের আইন অনুযায়ী প্রত্যেকের বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।