ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও-পাগলা) আসনের মানুষ এবার ভোটের মাধ্যমে তাদের পছন্দ স্পষ্ট করে দিয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার মো. সাইফুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে নবনির্বাচিত এমপির হাতে ফলাফলের কপি তুলে দেন।

ভোটের পরিসংখ্যান

এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯ হাজার ৩৬৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৯ হাজার ১২০ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ২৪১ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৩ জন। বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আক্তারুজ্জামান বাচ্চু পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৫৮৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী আবু বকর সিদ্দিকুর রহমান পেয়েছেন ৬৭ হাজার ১৩ ভোট। এ আসনে 'হ্যাঁ' ভোট পড়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার ৪১৪টি এবং 'না' ভোট পড়েছে ৫৮ হাজার ৩৩৪টি।

জনতার সাথে যোগাযোগের শক্তিতে জয়

গফরগাঁও-পাগলা এলাকায় সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকার জন্যই আলোচনায় এসেছেন মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানো, শিক্ষার্থীদের সহায়তা এবং সামাজিক সংগঠনের নানা কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি এখন 'জনতার বন্ধু' হিসেবে পরিচিত।

বিজয়ের পর এক স্থানীয় সভায় তিনি বলেন, “গফরগাঁও-পাগলার উন্নয়নই আমার অঙ্গীকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমরা জনগণের কল্যাণে নিবেদিত হয়ে কাজ করতে চাই।”

মসৃণ ছিল না জয়ের পথ

তবে এই জয়ের পথ একেবারে মসৃণ ছিল না। দলীয় মনোনয়ন নিয়েই শুরু থেকেই ছিল নানা টানাপোড়েন ও বিতর্ক। গত ডিসেম্বরে বিএনপি যখন তাকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেয়, তখন দলের একাংশের নেতাকর্মীরা প্রকাশ্য বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। গফরগাঁও পৌরশহরের শিবগঞ্জ সড়কসহ অন্তত ১০টি স্থানে বিক্ষোভকারীরা অগ্নিসংযোগ ও রেললাইন অবরোধ করে। এতে ঢাকা-ময়মনসিংহ রেল যোগাযোগ কয়েক ঘণ্টা বন্ধ ছিল।

জানুয়ারিতে প্রতীক বরাদ্দের দিন বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ও সাবেক জেলা নেতা আবু বকর সিদ্দিকুর রহমানের সমর্থকদের সঙ্গে ধানের শীষের অনুসারীদের তুমুল সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে পাঁচজন আহত হন এবং একটি রাজনৈতিক কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়। আক্তারুজ্জামান বাচ্চু তখন অভিযোগ করেন, তার শান্তিপূর্ণ মিছিলে বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকরা আগ্নেয়াস্ত্র ও বোমা হামলা চালিয়েছে।

কলেজ কমিটি ও বালু উত্তোলন বিতর্ক

গত বছর কান্দিপাড়া আব্দুর রহমান ডিগ্রি কলেজের অ্যাডহক কমিটি নিয়োগ নিয়েও বিতর্কে জড়ান তিনি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদিত ওই কমিটিতে আক্তারুজ্জামান বাচ্চুকে সভাপতি করে দেওয়া হয়। বিএনপির একাংশের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা করে এবং অর্থের বিনিময়ে তিনি এই কমিটি অনুমোদন করিয়েছেন। ওই সময় পাগলা থানা ছাত্রদলের নেতারা কমিটি প্রত্যাহারের দাবিতে 'দুর্বার আন্দোলন' গড়ার হুঁশিয়ারি দেন।

গত বছরের অক্টোবরে কালীবানা নদী থেকে বালু উত্তোলন নিয়েও বিতর্কের মুখে পড়েন তিনি। স্থানীয়রা অভিযোগ তোলেন, আক্তারুজ্জামান বাচ্চুর অনুসারী পাগলা থানা বিএনপির সেলিম মৃধার লোকজন নদী থেকে বালু তুলছে। এলাকাবাসী একটি ব্ল্যাকহেড বোট ও ড্রেজার জব্দ করলে ঘটনাস্থলে সংঘর্ষ বাধে। তবে নিজেকে জড়িয়ে দেওয়া এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “দলীয় প্রভাব দেখিয়ে কেউ অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।”

পাগলা থানা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক

মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন মুখ নন। তিনি পাগলা থানা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। এলাকায় উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে কাজ করাই তার মূল অঙ্গীকার বলে তিনি মনে করেন।

সামনের চ্যালেঞ্জ

বিতর্ক আর দলীয় কোন্দল পেছনে ফেলে অবশেষে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মোহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু। স্থানীয় বিএনপির অনেক নেতাই তার মনোনয়নের বিরোধিতা করলেও, শেষ পর্যন্ত ভোটের হিসাবে তিনি জিতেছেন। কিন্তু এখন তাকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে—যে দলের টিকিটে তিনি জিতেছেন, সেই দলের একাংশের আস্থা অর্জন।

গফরগাঁও-পাগলার মানুষ এখন চোখ রাখছেন নির্বাচনের আগে দেওয়া 'শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর' প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের দিকে। সব বিতর্ক-কোন্দল পেছনে ফেলে এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে পারেন কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Walton Ads