ভারতের আসাম রাজ্য সরকার সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ‘আদিবাসী’ বাসিন্দাদের অস্ত্র বহনের অনুমতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এই সিদ্ধান্তে রাজ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে তৈরি হয়েছে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা নিজেই এই সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেছেন।

বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় হিমন্ত বলেন, এমন একটি ওয়েবসাইট চালু করা হচ্ছে, যেখানে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী আদিবাসীরা যারা নিজেদের জীবনের হুমকিতে মনে করেন, তারা বন্দুকের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

তিনি জানান, আবেদন যাচাই-বাছাই করে, সিকিউরিটি চেকের মাধ্যমে এবং নির্দিষ্ট শর্তে লাইসেন্স দেওয়া হবে। লাইসেন্স পাওয়া ব্যক্তিদের ওপর থাকবে কড়া নজরদারি। লাইসেন্স হস্তান্তর করা যাবে না এবং নিয়মিত রিপোর্ট জমা দিতে হবে। জেলা প্রশাসন ও নিরাপত্তা সংস্থা যাদের ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করবে, কেবল তারাই এই সুবিধা পাবেন।

ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু জানায়, গত মে মাসেই আসাম মন্ত্রিসভা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সরকারের ভাষায়, সীমান্তবর্তী এবং পুলিশের আওতার বাইরে থাকা এলাকার মানুষকে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করতেই এই পদক্ষেপ।

মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত যেসব এলাকাকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তার মধ্যে আছে বারপেটা, ধিং, ধুবরি, জানিয়া, মরিগাঁও, নগাঁও, রূপাহি এবং দক্ষিণ সালমারা-মানকাচর। এসব এলাকায় বাংলাদেশি শিকড় আছে এমন মুসলিমদের বসবাস বেশি।

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী আসামের জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ। এর মধ্যে মুসলিমদের সংখ্যা ৩৫ শতাংশ, বাকিরা মূলত হিন্দু। হিমন্ত পূর্বে বলেছিলেন, অসমীয়াভাষী মানুষ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের কারণে নিজের গ্রামেও হুমকির মুখে রয়েছেন।

ভারতের অন্যান্য রাজ্যে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের নিয়ম কড়াকড়ি হলেও আসামে এই খোলামেলা নীতির কারণে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি গৌরব গগৈ বলেন, “এই সরকার জনগণের খাদ্য, বাসস্থান ও চাকরির চেয়ে বন্দুককেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এটি সংঘর্ষ ও অপরাধ বাড়াবে।”

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, বিজেপি ও আরএসএস সমর্থকদের হাতে অস্ত্র তুলে দিতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার মতে, এটি রাজ্যে গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব ও চাঁদাবাজির পরিবেশ তৈরি করবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, হিমন্ত সরকারের এই উদ্যোগ আসলে একটি বড় প্রচারণার অংশ। বিজেপি সরকার দীর্ঘদিন ধরেই অসমীয়াভাষী হিন্দুদের পক্ষ নিয়ে, বাংলাভাষী মুসলিমদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে আসছে।

২০১৯ সালে আসামেই প্রথম বিতর্কিত নাগরিকত্ব যাচাই (NRC) চালু হয়, যেখানে প্রায় ২০ লাখ মানুষ বাদ পড়ে। এদের অধিকাংশই মুসলিম, যাদের বহু পুরনো ভারতীয় নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও পরিচয় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।

সম্প্রতি বাংলাদেশে সরকারের পরিবর্তন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়েও হিমন্ত বিশ্বশর্মা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রভাব সীমান্তবর্তী আসামে পড়তে পারে। তাই আদিবাসীদের অস্ত্রধারী করেই পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে চায় তাঁর সরকার।

news