যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন ঝড় তুলেছেন। চীনের বিরল মৃত্তিকা রপ্তানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ জারি করার ঘটনায় তিনি চীনকে ‘অত্যন্ত শত্রুতাপূর্ণ দেশ’ আখ্যা দিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

তবে বেইজিংয়ের মতে, আসলে যুক্তরাষ্ট্রই উত্তেজনার নতুন আগুন জ্বালিয়েছে—চীনা কোম্পানির ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেই। ফলে বেইজিং বাধ্য হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের রপ্তানিতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে।

 নতুন করে শুল্কের হুমকি, বেইজিংয়ের পাল্টা ঘোষণা

সপ্তাহান্তে উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে, যখন ট্রাম্প বলেন—চীনের নতুন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের জবাবে তিনি চীনের ওপর তিন অঙ্কের শুল্ক বসাবেন। জবাবে চীনও জানায়, তারা ‘সম্পর্কিত ব্যবস্থা’ নিতে প্রস্তুত।

এই দুই পরাশক্তির পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে বিশ্ববাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, উৎপাদন খাত উদ্বেগে, আর আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কায় পড়েছেন—ফের শুরু হতে পারে নতুন বাণিজ্য যুদ্ধ।

 বাণিজ্য আলোচনায় অচলাবস্থা, বৈঠক নিয়ে অনিশ্চয়তা

এই উত্তেজনা এখন মাসের শেষে দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পরিকল্পিত বৈঠককেও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

যদিও মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট আশাবাদী যে বৈঠকটি এখনও হতে পারে, বেইজিং জানিয়ে দিয়েছে—“হুমকির মধ্য দিয়ে সংলাপ সম্ভব নয়।”

চীনের দাবি, ট্রাম্প প্রশাসন যদি সেপ্টেম্বরে নতুন নিষেধাজ্ঞা না দিত, তাহলে এমন পরিস্থিতি আসত না। কারণ তখনই মার্কিন কর্তৃপক্ষ হাজারের বেশি চীনা প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ তালিকায় যুক্ত করে।

 “যুক্তরাষ্ট্র এখন ভুক্তভোগীর অভিনয় করছে” — চীনা বিশেষজ্ঞদের কটাক্ষ

রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ জিন ক্যানরং বলেন,

“ওয়াশিংটনের ছোট ছোট কৌশলের জবাবই দিয়েছে বেইজিং। যুক্তরাষ্ট্র আগে চীনকে আঘাত করেছে, এখন আবার নিজেকে নির্দোষ দেখাচ্ছে।”

ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক উ জিনবোও একমত। তার মতে,

“চীনের দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ অত্যন্ত বিদ্বেষপূর্ণ। ট্রাম্পের দল আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সম্পূর্ণ অযোগ্য প্রমাণ দিচ্ছে।”

 বিরল মৃত্তিকার দখলে চীন, প্রযুক্তি দুনিয়ায় বিপর্যয়ের আশঙ্কা

চীন বিশ্বের বিরল মৃত্তিকার প্রায় একচেটিয়া সরবরাহকারী, যা সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক্স, গাড়ি এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে অপরিহার্য।

নতুন নিয়মে শুধু রপ্তানি নয়, বরং প্রযুক্তি, উৎপাদন পদ্ধতি ও বিদেশি ব্যবহারের ওপরও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে চীন। এতে বিশ্বের বড় বড় শিল্পখাত—বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) চিপ নির্মাণ—প্রভাবিত হতে পারে।

বেইজিং অবশ্য জানিয়েছে, এটি কোনো নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং প্রয়োজনীয় মান পূরণকারী সংস্থাগুলো লাইসেন্স পাবে।

 যুক্তরাষ্ট্রের নীতির প্রতিচ্ছবি বলছে বিশ্লেষকরা

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের এই পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের “ফরেন ডিরেক্ট প্রোডাক্ট রুল”-এর প্রতিক্রিয়া, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েক বছর ধরে চীনের চিপ ও প্রযুক্তি রপ্তানিতে কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এসেছে।

ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের উ বলেন,

“বাইডেন হোক বা ট্রাম্প—যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞার পাহাড় গড়েছে। বেইজিং সেই সব হিসাব এখন কষছে।”

🕊️ ট্রাম্পের সুরে হঠাৎ পরিবর্তন

সবশেষে ট্রাম্প নিজেই কিছুটা নরম সুরে বলেন,

“আমরা চীনকে সাহায্য করতে চাই, ক্ষতি করতে নয়। চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে!”

তবে চীনা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই ‘নরম ভাষণ’ আসলে রাজনৈতিক কৌশল মাত্র।

রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়াং ইওয়েই বলেন,

“চীন এখন ট্রাম্পের কৌশল, তার দুর্বলতা ও ‘চুক্তির শিল্প’—সবই বুঝে গেছে। এবার ভয় পাওয়ার পালা যুক্তরাষ্ট্রের।”

উপসংহার

বিশ্ব অর্থনীতির দুই দৈত্যের এই নতুন সংঘাত শুধু বাণিজ্য নয়, প্রযুক্তি ও কূটনীতির ভবিষ্যতকেও গভীর অনিশ্চয়তায় ফেলছে। আর সবশেষ প্রশ্ন একটাই—চীন-আমেরিকার এই লড়াইয়ে কে জিতবে, আর কে হারবে?

 

Walton Ads