গাজা যুদ্ধবিরতির পর সোমবার যখন বিশ্ব নেতাদের সামনে বিজয়ী ভঙ্গিতে উপস্থিত হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তখন তিনি হেসে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানকে বললেন—“আমার প্রিয় ফিল্ড মার্শাল!”

তারপরেই ট্রাম্প মঞ্চ ছাড়লেন, মঞ্চে উঠে এলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ। ক্যামেরার সামনে তিনি ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টার প্রশংসা করে ঘোষণা দিলেন—তিনি আবারও ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করতে চান।

এক বছর আগেও এমন দৃশ্য কল্পনা করা যেত না।

দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে সম্পর্ক এবং মার্কিন সন্দেহের কারণে পাকিস্তান ছিল ওয়াশিংটনের চোখে প্রায় অপ্রিয় এক রাষ্ট্র। বাইডেন প্রশাসন কখনও পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রীদের ফোন পর্যন্ত করেনি। এমনকি আফগানিস্তান থেকে বিশৃঙ্খল মার্কিন প্রত্যাহারের পর, বাইডেন প্রকাশ্যে পাকিস্তানকে বলেছিলেন “বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশগুলোর একটি।”

কিন্তু ট্রাম্পের রাজনীতিতে পুরনো বন্ধু আর শত্রুর সংজ্ঞা বদলে গেছে। যে কেউ লাভবান করতে পারে, সে-ই ট্রাম্পের নতুন বন্ধু। আর এই খেলায় পাকিস্তান হয়ে উঠেছে মাস্টারপ্লেয়ার।

 ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে পাকিস্তান

ওয়াশিংটনে এখন পাকিস্তানি নেতারা নিয়মিত অতিথি। ট্রাম্পের খোলামেলা সমালোচনার হাত থেকে তারা নিরাপদ। দেশটির সেনাবাহিনী পাচ্ছে নতুন মার্কিন রেথিয়ন ক্ষেপণাস্ত্র, আর কূটনীতিকরা ভারতের তুলনায় অনেক কম শুল্কে বাণিজ্য সুবিধা পেতে সক্ষম হয়েছে।

এমনকি পাকিস্তানকে এখন দেওয়া হচ্ছে চীন-নিয়ন্ত্রিত নয় এমন গুরুত্বপূর্ণ “rare earth minerals” বা বিরল মৃত্তিকা সম্পদের অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার—যা আইফোন থেকে শুরু করে যুদ্ধবিমান পর্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তির মূল উপাদান।

 আসিম মুনির—“ট্রাম্পের প্রিয় ফিল্ড মার্শাল”

এই নাটকীয় কূটনৈতিক উত্থানের কেন্দ্রবিন্দু ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। ৫৭ বছর বয়সী সাবেক আইএসআই প্রধান, যিনি ২০২২ সালে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান হন। তার নেতৃত্বেই পাকিস্তান গত মে মাসে ভারতের সঙ্গে চার দিনের সংঘাতে জড়ায়।

সংঘর্ষে উভয় দেশের সৈন্য ও বেসামরিক লোক নিহত হয়, এবং পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কায় বিশ্ব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ঠিক তখনই ট্রাম্প মধ্যস্থতা করেন, উভয় পক্ষকে যুদ্ধ থামাতে বলেন এবং দাবি করেন “শান্তি তার কারণে এসেছে।” পাকিস্তানও প্রকাশ্যে সেটি সমর্থন করে, এমনকি ট্রাম্পকে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে—তার দ্বিতীয় মেয়াদে প্রথম কোনো দেশ হিসেবে।

ভারত অবশ্য ট্রাম্পের ভূমিকা অস্বীকার করেছে। কিন্তু পাকিস্তান দাবি করে, তারা সাতটি ভারতীয় জেট ভূপাতিত করেছে—একই তথ্য ট্রাম্প প্রকাশ্যে কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করেছেন।

হোয়াইট হাউসে খনিজ উপহার

সংঘাতের কয়েকদিন পর মুনির যান ওয়াশিংটনে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পাকিস্তানি সেনাপ্রধান সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে লাঞ্চ করেন, কোনো বেসামরিক প্রতিনিধির উপস্থিতি ছাড়াই। সেখানে তিনি ট্রাম্পকে একটি কাঠের বাক্স উপহার দেন, যার মধ্যে ছিল পাকিস্তানের খনিজ সম্পদের নমুনা।

শীঘ্রই মিসৌরি-ভিত্তিক সংস্থা U.S. Strategic Metals ঘোষণা দেয়—তারা পাকিস্তান থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের খনিজ আমদানি শুরু করছে। এতে ছিল অ্যান্টিমনি, কপার, এবং নিওডিয়ামিয়ামসহ নানা বিরল উপাদান।

এসব সম্পদের বেশিরভাগই পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে, যেখানে বহু বছর ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহ চলছে। যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি ঐ বিদ্রোহী গোষ্ঠী BLA-কে আনুষ্ঠানিকভাবে “সন্ত্রাসী সংগঠন” ঘোষণা করেছে। পরের মাসেই পাকিস্তানকে রেথিয়ন অ্যাডভান্সড এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল বিক্রির অনুমোদন দেয় মার্কিন সরকার।

 “ট্রাম্পকে পছন্দ করে পাকিস্তান, তাই তিনিও পাকিস্তানকে পছন্দ করেন”

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সম্পর্কের গভীরে আছে পারস্পরিক লাভ। পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, আবার ট্রাম্পও পেয়ে যাচ্ছেন এমন এক মিত্র, যে তাকে খুশি রাখে ও প্রশংসায় ভাসায়।

ওয়াশিংটন ডিসির হাডসন ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক হুসেন হাক্কানি বলেন,
“ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি সম্পূর্ণ অপ্রচলিত। তিনি এখন পাকিস্তানকে পছন্দ করেন কারণ পাকিস্তান তাকে পছন্দ করে—এবং নোবেল পুরস্কারের মনোনয়নের মতো প্রশংসা করে।”

তবে অনেকেই সতর্ক করে বলছেন, পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা সেনাবাহিনীর, যা আবারও দেশের বেসামরিক রাজনীতির প্রভাব কমিয়ে দিচ্ছে।

তবুও, ওয়াশিংটনে এখন একটাই বাস্তবতা—ট্রাম্পের মঞ্চে পাকিস্তান জয় করছে কৌশলে, কূটনীতিতে, আর খনিজ সম্পদে।

 

Walton Ads