বিশ্বজুড়েই বিভিন্ন দেশের সামরিক বাহিনীগুলো আরও আধুনিক অস্ত্র পাওয়ার জন্য তোড়জোড় চালাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নানাভাবে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে থাকাও এর একটা কারণ। তবে এসব বাহিনীর কর্মকাণ্ডই ক্রমাগতভাবে কার্বন নিঃসরণ বাড়িয়ে চলেছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক প্রতিবেদনে সতর্ক করেছেন—সামরিক খরচ বাড়তে থাকার এই প্রবণতা জলবায়ু বিপর্যয়কে আরও ত্বরান্বিত করছে। তাঁর মতে, বিশ্বজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বাড়লে সামরিক খরচও বাড়বে, ফলে কার্বন নিঃসরণ আরও বেড়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত বিপুল অর্থ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও অভিযোজনের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদও কমে যাচ্ছে।
সামরিক বাহিনী আসলে কতটা কার্বন নিঃসরণ করে?
জাতিসংঘ মহাসচিবের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষজ্ঞদের অনুমান অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী সামরিক খাত মোট বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৩.৩ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত দায়ী।
যদি বিশ্বের সামরিক বাহিনীগুলোকে একটি দেশ হিসেবে ধরা হয়, তবে তারা চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের পর চতুর্থ বৃহত্তম নিঃসরণকারী হবে। ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যের দাতব্য সংস্থা কনফ্লিক্ট এন্ড এনভায়রনমেন্ট অবজারভেটরি এবং সাইনটিস্ট ফর গ্লোবাল রেসপন্সিবিলিটি-এর যৌথ গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।
এছাড়াও, বিশ্বব্যাপী সামরিক বাজেটের ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধি ইঙ্গিত দেয় যে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে চলেছে। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় পৌঁছেছে ২.৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ৯.৪ শতাংশ বেশি। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউট এটিকে স্নায়ু যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের সর্বোচ্চ বৃদ্ধি বলে উল্লেখ করেছে।
প্রতিবেদনটি জানায়, ২০২৪ সালে ১০০টিরও বেশি দেশ তাদের সামরিক খরচ বাড়িয়েছে, বিশেষত ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রবৃদ্ধি ছিল দ্রুতগতির।
এ বছরের শুরুতে নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশন (ন্যাটো) ঘোষণা করেছে, তাদের সদস্য রাষ্ট্রগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে ব্যয় জিডিপির ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করবে। এর আগে ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মোট সামরিক কার্বন ফুটপ্রিন্ট ৩ কোটি (৩০ মিলিয়ন) টন বেড়েছে—যা ওই সময়ে সামরিক খরচ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই ঘটেছে। এটি রাস্তার ওপর অতিরিক্ত ৮০ লাখেরও বেশি গাড়ি যোগ হওয়ার সমান।
সবচেয়ে বড় দূষণকারী কারা?
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে আসল চ্যালেঞ্জ হলো ভারী অস্ত্র ব্যবস্থা যেমন যুদ্ধবিমান, ট্যাংক, যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিনকে ডিকার্বনাইজ (কার্বন নির্ভরতা কমানো) করা, কারণ এগুলো চালাতে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন।
তারা বলেন, বিশ্বব্যাপী যুদ্ধবিমানগুলো বর্তমানে চালু থাকা সবচেয়ে বেশি জ্বালানিখেকো যন্ত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে, গত অর্ধশতকে ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার (যুদ্ধ বিভাগ)-এর মোট জ্বালানি ব্যবহারের ৫৫ শতাংশ এসেছে জেট ফুয়েল থেকে।
২০২২ সালের 'ন্যাচার' জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান যখন ১০০ নটিক্যাল মাইল (১৮৫ কিলোমিটার) ওড়ে, তখন এটি যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করে, তা যুক্তরাজ্যের একটি সাধারণ পেট্রোলচালিত গাড়ির এক বছরের নিঃসরণের সমান। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, শুধু মার্কিন সামরিক বাহিনীর জেট ফুয়েল ব্যবহারই প্রতিবছর ছয় মিলিয়ন মার্কিন যাত্রীবাহী গাড়ির সমপরিমাণ নিঃসরণ ঘটায়।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউট এর তথ্যানুযায়ী, তারপরও, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র আগের বছরের তুলনায় ৫.৭ শতাংশ সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে এবং বিশ্বের বৃহত্তম প্রতিরক্ষা ব্যয়কারী দেশ হিসেবে রয়ে গেছে।
কনফ্লিক্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অবজারভেটরি -এর ডগ ওয়েয়ার বলেন, "অস্ত্র ভাণ্ডার বাড়ানোর জন্য সামরিক উৎপাদন বৃদ্ধি অত্যন্ত জ্বালানি-নির্ভর, অথচ কম কার্বন নির্ভর সামরিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এখনো সীমিত।"
স্পষ্ট অগ্রাধিকার: যুদ্ধ নাকি পৃথিবী?
বিবিসি যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ারকে জিজ্ঞেস করেছিল যে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির ফলে তাদের কার্বন নিঃসরণে কী প্রভাব পড়তে পারে এবং সামরিক খাতকে ডিকার্বনাইজ করার কোনো পরিকল্পনা আছে কি না।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল ইমেইল জবাবে বিবিসিকে জানান, "যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অফ ওয়ার জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা সংক্রান্ত সেইসব কর্মসূচি ও উদ্যোগ বাতিল করছে, যা আমাদের মূল যুদ্ধ পরিচালনার মিশনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।"
তিনি আরও বলেন, "আমরা মূলত প্রাণঘাতী সক্ষমতা বৃদ্ধি, যুদ্ধ পরিচালনা এবং প্রস্তুতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।" ন্যাটোকে একই ধরনের প্রশ্ন পাঠানো হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা শিল্পগুলো তাদের পরিকল্পনায় জ্বালানি দক্ষতা ও টেকসই উন্নয়নকে অন্তর্ভুক্ত করা শুরু করলেও, বর্তমানে তৈরি হওয়া অস্ত্র ব্যবস্থা কার্যকর হতে এখনো বহু বছর লাগবে।
যুদ্ধের খরচ বনাম জলবায়ু অর্থায়ন
যুদ্ধের কারণে জলবায়ুর ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নিরূপণ করা কঠিন, তবে চলমান কিছু যুদ্ধ এর পরিবেশগত প্রভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার ধারণা দেয়। ২০২৪ সালের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রথম দুই বছরে প্রায় ১৭৫ মিলিয়ন (১৭ কোটি ৫০ লাখ) টন গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হয়েছে। আরেকটি গবেষণা অনুযায়ী, ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের সরাসরি সামরিক কর্মকাণ্ড থেকে প্রায় ১.৯ মিলিয়ন (১৯ লাখ) টন কার্বন নিঃসরণ হয়েছে, যা ৩৬টি দেশ ও অঞ্চলের বার্ষিক নিঃসরণের থেকেও বেশি।
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল রিচার্ড নুজি বলেন, "দ্রুতগতির যুদ্ধবিমান, ফ্রিগেট যুদ্ধজাহাজ বা ট্যাংক—এখনো আমাদের হাতে এমন কোনো প্রযুক্তি নেই যা শূন্য নিঃসরণ সক্ষমতা দিতে পারে।"
অর্থাৎ প্রতিরক্ষার জন্য যত বেশি অর্থ ব্যয় হবে, জলবায়ু অর্থায়নের জন্য তত কম অর্থ পাওয়া যাবে। জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রতিবেদন অনুযায়ী, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের বার্ষিক অর্থায়ন ঘাটতি ইতোমধ্যেই ৪ ট্রিলিয়ন ডলার। এই ঘাটতি আগামী বছরগুলোতে ৬.৪ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে, ঠিক তখনই বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় ২০৩৫ সালের মধ্যে ৬.৬ ট্রিলিয়ন ডলার ছুঁতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের ধনী দেশগুলো জলবায়ু অর্থায়নে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য যে অর্থ ব্যয় করছে, তার তুলনায় ৩০ গুণ বেশি অর্থ সামরিক খাতে ব্যয় করছে।
পানামার জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি হুয়ান কার্লোস মন্টেরি গোমেজ প্রশ্ন তুলেছেন, "একে অপরকে হত্যার জন্য ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় খুব বেশি নয়, কিন্তু জীবন বাঁচানোর জন্য ১ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করা অযৌক্তিক বলে মনে হয়।"
তবে জেনারেল নুজি বিশ্বাস করেন, "যুদ্ধে সামরিক বাহিনীর নিঃসরণ বাড়া ঠেকানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো শুরুতেই একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী তৈরি করা, যা প্রতিরোধ হিসেবে কাজ করবে।" কিন্তু অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী কি সত্যিই মানুষকে ভেঙে পড়া জলবায়ুর ধ্বংসাত্মক প্রভাব থেকে রক্ষা করতে পারবে, নাকি উল্টো সেই প্রভাবকে আরও ত্বরান্বিত করবে?
