জাতিসংঘের এক বিশেষ দূত আল জাজিরাকে বলেছেন, বিশ্ব যেন আবার ‘সাম্রাজ্যবাদের যুগে’ ফিরে যাওয়ার পথে হাঁটছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আইনকে সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণের পর বিশ্বজুড়ে যে আগ্রাসী নীতি তিনি অনুসরণ করছেন, তা কেবল তার “নিজস্ব নৈতিকতা” দিয়েই নিয়ন্ত্রিত হবে—এমন মন্তব্য করেন ট্রাম্প।
বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্ক টাইমসকে ট্রাম্প বলেন, “আমার আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই। আমি মানুষকে আঘাত করতে চাই না।”
আন্তর্জাতিক আইন মানেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি মানেন, তবে সেটি “আন্তর্জাতিক আইনের আপনার সংজ্ঞার ওপর নির্ভর করে”।
পররাষ্ট্র নীতির লক্ষ্য পূরণে মার্কিন সেনাবাহিনীর শক্তি প্রয়োগে তিনি যে প্রস্তুত, সেটিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন ট্রাম্প।
শনিবার ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ওপর হামলা শুরু করে। রাজধানী কারাকাস ও দেশটির সামরিক ঘাঁটিতে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়।
এরপর মার্কিন সেনারা কারাকাস থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে। সমালোচকদের মতে, এটি জাতিসংঘ সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন, যেখানে কোনো দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার ওপর এই হামলা ট্রাম্পের যুদ্ধবাজ মনোভাব আরও স্পষ্ট করেছে বলে মনে করছেন অনেকে। অথচ মাত্র গত মাসেই তিনি প্রথম ফিফা শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন।
হামলার পর ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে “চালিয়ে” নেবে এবং দেশটির বিশাল তেলের মজুদ ব্যবহার করবে। যদিও তার প্রশাসন দাবি করেছে, তারা অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের সঙ্গে কাজ করবে।
তবে প্রশাসন এটাও জানিয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারকে তারা নীতিগত “নির্দেশনা” দেবে। মার্কিন দাবি উপেক্ষা করা হলে সামরিক অভিযানের “দ্বিতীয় ধাপ” চালানোর হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
রোববার দ্য আটলান্টিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “রদ্রিগেজ সঠিক কাজ না করলে তাকে অনেক বড় মূল্য দিতে হবে, হয়তো মাদুরোর চেয়েও বড়।”
এই সপ্তাহের শুরুতে ট্রাম্প কলম্বিয়ার বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রোর বিরুদ্ধেও হামলার ইঙ্গিত দেন। পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ডের ডেনিশ অঞ্চল দখলের প্রচারণাও জোরদার করেন।
গত জুনে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধে যুক্ত হন এবং দেশটির তিনটি বড় পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার নির্দেশ দেন।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী স্টিফেন মিলার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কড়া সমালোচনা করে বলেন, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধে নিজের স্বার্থ রক্ষায় “কোনো ক্ষমা ছাড়াই” সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে।
সোমবার সিএনএনকে মিলার বলেন, “আমরা একটি পরাশক্তি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অধীনে আমরা পরাশক্তির মতোই আচরণ করব।”
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করা যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো বিশ্বের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
আন্তর্জাতিক আইন মূলত রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণের নিয়মকানুনের সমষ্টি, যার মধ্যে জাতিসংঘের সনদ ও বহু আন্তর্জাতিক চুক্তি রয়েছে।
বিচারক ও আইনজীবীদের স্বাধীনতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত মার্গারেট স্যাটার্থওয়েট আল জাজিরাকে বলেন, আন্তর্জাতিক আইন বাতিলের মতো বক্তব্য “অত্যন্ত বিপজ্জনক”।
তার আশঙ্কা, বিশ্ব আবার ‘সাম্রাজ্যবাদের যুগে’ ফিরে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করলে ওয়াশিংটনের প্রতিপক্ষরাও নিজেদের আগ্রাসন শুরু করতে উৎসাহ পাবে।
স্যাটার্থওয়েট বলেন, “আন্তর্জাতিক আইন সবসময় রাষ্ট্রগুলোকে ভয়াবহ কাজ করা থেকে থামাতে পারে না। কিন্তু আমরা যদি এটুকুও মানতে অস্বীকার করি, পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।”
তিনি গাজার পরিস্থিতির উদাহরণ দিয়ে বলেন, বহু চেষ্টা সত্ত্বেও নৃশংসতা বন্ধ হয়নি। তবুও আন্তর্জাতিক আইনের ওপর জোর না দিলে বিশ্ব আরও বিপজ্জনক পথে নামবে।
ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইনের সহকারী অধ্যাপক ইউসরা সুয়েদি সতর্ক করে বলেন, আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করা অন্য রাষ্ট্রগুলোকেও একই পথে হাঁটার সুযোগ করে দেবে—যেমন চীন বা রাশিয়া।
নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ইয়ান হার্ড বলেন, ল্যাটিন আমেরিকায় মার্কিন নীতির ইতিহাসই এর ঝুঁকির বড় প্রমাণ।
এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চল মার্কিন হামলা ও মার্কিন-সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানের শিকার হয়েছে, যার ফল হিসেবে এসেছে অস্থিরতা, দমন-পীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন।
হার্ড বলেন, “পানামা থেকে হাইতি, নিকারাগুয়া থেকে চিলি—৭০-এর দশকজুড়ে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে।”
তার মতে, ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের নীতি যুক্তরাষ্ট্রের পুরনো হস্তক্ষেপমূলক কৌশলের সঙ্গেই মিল রয়েছে।
তিনি বলেন, “প্রতিটি ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র পরে অনুতপ্ত হয়েছে। এ ধরনের হস্তক্ষেপ কখনোই ভালো ফল বয়ে আনে না।”
