এপ্রিল ৮-এর যুদ্ধবিরতির পর পাঁচ সপ্তাহের টানা সংঘাতের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন শুরু হয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় ইরানের সামরিক অবকাঠামোর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, পাল্টা হামলা ও কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখার দাবি করছে তেহরান। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংঘাত শুধু সামরিক নয়—আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে।
পাঁচ সপ্তাহের তীব্র সংঘাতের পর এপ্রিল ৮-এ কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি নতুন করে পরিস্থিতি বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি করেছে। ইসরায়েলি সামরিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, তাদের এবং যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ধ্বংস বা অকার্যকর করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ও সংরক্ষণাগারগুলোর বড় অংশে আঘাত হানা হয়েছে।
ইসরায়েলি বিমান বাহিনী যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৭০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এসব হামলার মধ্যে ড্রোন ইঞ্জিন কারখানা, অস্ত্র গবেষণা কেন্দ্র এবং সামরিক অবকাঠামো ছিল উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরাক হেভি ওয়াটার প্ল্যান্ট, পারচিন এবং ইসফাহানের বিভিন্ন স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
তবে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এসব হামলা তাদের কৌশলগত সক্ষমতাকে পুরোপুরি ভেঙে দিতে পারেনি। বরং দেশটি তার প্রতিরক্ষা কাঠামো পুনর্গঠন এবং বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে আরও শক্তিশালী হওয়ার পথে এগোচ্ছে। এক ইরানি কর্মকর্তা বলেন, “এই যুদ্ধ আমাদের দুর্বল করেনি, বরং আমাদের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও দৃঢ় করেছে।”
সংঘাত চলাকালে ইরান ইসরায়েল, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি এবং বিভিন্ন দেশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। প্রায় ৫৪০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হলেও, ইসরায়েলের দাবি—তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ৯০ শতাংশের বেশি হামলা প্রতিহত করেছে। তবে এসব হামলায় অন্তত ২১ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে, ইসরায়েলের টার্গেটেড হত্যাকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইরানের শীর্ষ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর হামলা চালানো হয়, যা আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের পদক্ষেপ আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
ইরানের অভ্যন্তরে ইমাম হোসেইন বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার মাধ্যমে গবেষণা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে পেট্রোকেমিক্যাল ও ইস্পাত শিল্পে আঘাত হেনে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, লেবাননে সংঘাতও সমান্তরালভাবে তীব্র হয়েছে। হিজবুল্লাহ প্রায় ৬ হাজার রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। এর জবাবে ইসরায়েল লেবাননে ব্যাপক স্থল ও বিমান অভিযান শুরু করে। এতে অন্তত ১,৪০০ হিজবুল্লাহ সদস্য নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এই পুরো সংঘাতে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ লেবানন থেকে হামলা বন্ধ করা যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে বেসামরিক অবকাঠামোর ভেতরে সামরিক কার্যক্রম চালানোর অভিযোগও উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত একটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ, যেখানে ইরান তার আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখতে চায়, আর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সেই প্রভাব সীমিত করার চেষ্টা করছে। তবে সমালোচকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণাত্মক নীতি পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে এবং দীর্ঘমেয়াদে শান্তির পথে বাধা সৃষ্টি করছে।
একজন মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, “শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া এই সংঘাত বারবার ফিরে আসবে।”
সব মিলিয়ে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। ইরান তার অবস্থান ধরে রাখার বার্তা দিচ্ছে, আর ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের দাবি করছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
