রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা বিশ্বের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আদতে কোনো লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে কি না, তা নিয়ে খোদ ওয়াশিংটনেই প্রশ্ন উঠেছে। শত বাধা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও রাশিয়ার অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা এবং বিকল্প বাজার তৈরির দক্ষতা পুতিন সরকারকে এক অপরাজেয় অবস্থানে নিয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন ও আমেরিকার বর্তমান নীতি রাশিয়ার সমরযন্ত্রকে থামানোর পরিবর্তে বরং দেশটিকে আরও স্বাবলম্বী করে তুলেছে।

ইউক্রেন সংকটের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা রাশিয়ার ওপর হাজারো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে এটি স্পষ্ট যে, ক্রেমলিনকে অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার যে লক্ষ্য ওয়াশিংটন নির্ধারণ করেছিল, তা এখনো একটি দূরবর্তী স্বপ্ন হিসেবেই রয়ে গেছে।

রাশিয়ার অর্থনীতি মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার বিরুদ্ধে এক অনন্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। দেশটির সাধারণ মানুষ দীর্ঘকাল ধরেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শিখেছে, যা তাদের পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি সহনশীল করে তুলেছে।

রাশিয়ানদের ঋণনির্ভর জীবনযাপনে অনাগ্রহ দেশটির অর্থনীতির অন্যতম শক্তির ভিত্তি। যেখানে উন্নত দেশগুলোর পারিবারিক ঋণের পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৭০ শতাংশ, সেখানে রাশিয়ায় এটি মাত্র ২২ শতাংশ। ফলে সুদের হার বাড়ানো বা পশ্চিমা ব্যাংকিং ব্যবস্থার কঠোরতা সাধারণ রুশ পরিবারগুলোকে তেমন প্রভাবিত করতে পারছে না।

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রসনেফট এবং লুকঅয়েলের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দেয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাশিয়ার তেলের বাজার এতটাই বিস্তৃত যে, কেবল নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেশটির আয়ের প্রধান উৎস বন্ধ করা সম্ভব নয়।

পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার তেল রপ্তানিকে 'ক্রেমলিনের সমরযন্ত্রের প্রাণভোমরা' হিসেবে চিহ্নিত করলেও, রাশিয়া অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে এই বাধা কাটিয়ে উঠছে। বর্তমানে প্রায় ২ হাজার তেলের ট্যাঙ্কারের এক 'শ্যাডো ফ্লিট' বা ছায়া বহর ব্যবহার করে রাশিয়া নির্বিঘ্নে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ করছে।

রাশিয়ার এই কৌশলগত সফলতার বিপরীতে ইউক্রেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতিমালার চরম ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে। নিষেধাজ্ঞার মধ্যে অসংখ্য ফাঁকফোকর ও দুর্বল প্রয়োগের সুযোগ নিয়ে মস্কো গত চার বছর ধরে নিয়মিত তার বাণিজ্য পথ পরিবর্তন করেছে এবং নতুন নতুন অংশীদার খুঁজে নিয়েছে।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যটি হলো, পশ্চিমা প্রযুক্তি ব্যবহার করেই রাশিয়ার অস্ত্র তৈরি হচ্ছে। ২০২৫ সালের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৭০০ জনের বেশি ইউক্রেনীয় নাগরিক রাশিয়ার এমন সব অস্ত্রের আঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন, যেগুলোতে টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টস ও এনালগ ডিভাইসেসের মতো মার্কিন প্রতিষ্ঠানের ইলেকট্রনিক উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে।

এটি প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞার কথা বলছে, অন্যদিকে তাদেরই তৈরি সামরিক সরঞ্জাম রাশিয়ার হাতে পৌঁছানো রুখতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই স্ববিরোধী অবস্থান পশ্চিমা জোটের নৈতিক ও কৌশলগত পরাজয় হিসেবেই দেখছেন অনেকে।

পশ্চিমা দেশগুলো আশা করেছিল যে অর্থনৈতিক কষ্টে রাশিয়ার সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসবে, যা পুতিন সরকারকে চাপের মুখে ফেলবে। কিন্তু এই ধারণা রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করার নামান্তর। মস্কো জনমতের তোয়াক্কা না করে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

২০১১-১৩ সালের বলত্নায়া আন্দোলনের উদাহরণ টেনে বিশ্লেষকরা বলছেন, বড় ধরনের বিক্ষোভও রাশিয়ার রাষ্ট্রকাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। বরং প্রতিটি সংকট পরবর্তী সময়ে বর্তমান প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ করেছে।

 রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর 'ধীরে চলো' নীতি মূলত রাশিয়াকে অভিযোজন করার পর্যাপ্ত সময় দিচ্ছে। প্রতিটি নতুন নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে মস্কো আরও উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলছে।

রাশিয়ার ২০২৫ সালের বাজেট ঘাটতি ৫.৬৪ ট্রিলিয়ন রুবেল হলেও, দেশটি একে কোনো বড় বিপদ হিসেবে দেখছে না। তেল ও গ্যাস থেকে আসা বিশাল আয় এবং নতুন বাণিজ্য রুট ব্যবহারের মাধ্যমে মস্কো এই ঘাটতি সহজেই মোকাবিলা করার সক্ষমতা অর্জন করেছে।

রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট—ওয়াশিংটনের কোনো প্রশাসনই রাশিয়ার এই অর্থনৈতিক অভিযোজন ক্ষমতার সঠিক মূল্যায়ন করতে পারছে না। একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও সেগুলোর কার্যকারিতা যাচাই করার চেয়ে রাজনৈতিক প্রচারণাই সেখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে।

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে জনৈক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান:
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাগুলো রাশিয়ার জন্য শাপে বর হয়েছে। আমরা এখন আমাদের নিজস্ব শিল্প ও প্রযুক্তির ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল এবং আমরা প্রমাণ করেছি যে আমাদের ছাড়া বিশ্ব অর্থনীতি অচল।

শেষে বলা যায়, ইউক্রেন যুদ্ধে অস্ত্র সরবরাহ এবং অকার্যকর নিষেধাজ্ঞার চক্র থেকে বেরিয়ে না এলে পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার অবস্থানকে আরও জোরালো করবে। মস্কোর এই দৃঢ় অবস্থান প্রমাণ করে যে, কেবল অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে একটি সামরিক ও জ্বালানি শক্তিকে দমানো অসম্ভব।

news