যে ইরান একসময় ইসরায়েলকে তেল, গোয়েন্দা তথ্য এবং সামরিক সহযোগিতা দিত, সেই ইরানই আজ ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় শত্রু। কিন্তু সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের নতুন সামরিক জোট কি দুই চরম প্রতিদ্বন্দ্বীকে আবার একই টেবিলে বসাতে পারে? ইতিহাস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো শত্রুতাই চিরস্থায়ী নয়।

ভাবুন, একসময় ইরানের সরকার ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদকে একটি হত্যার অনুরোধ করেছিল। লক্ষ্য ছিলেন বিপ্লবী নেতা আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনি, যিনি তখন প্যারিসে নির্বাসনে ছিলেন। সেই অনুরোধ শেষ পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করে মোসাদ। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে, ইরান ও ইসরায়েল কি আবার কোনো গোপন সমঝোতায় যেতে পারে? বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের ফিরতে হবে উনিশশো ঊনআশি সালের ইরানে। সেখান থেকেই শুরু হচ্ছে এই বিশ্লেষণ।

উনিশশো ঊনআশি সালের জানুয়ারিতে ইরানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর সরকার জনসমর্থন হারাচ্ছিল। বিপ্লবী আন্দোলন দেশের বড় শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছিল। নির্বাসিত খোমেনি ফ্রান্সের প্যারিস থেকে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী শাপুর বাখতিয়ার তখন ক্ষমতা ধরে রাখার শেষ চেষ্টা করছিলেন। এই সময় তিনি তেহরানে নিযুক্ত মোসাদ স্টেশনপ্রধান এলিয়েজার তসাফরির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বাখতিয়ারের অনুরোধ ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি চেয়েছিলেন, খোমেনিকে প্যারিসে হত্যা করা হোক। এই প্রস্তাবের পেছনে ছিল বিপ্লব থামানোর মরিয়া পরিকল্পনা।

মোসাদের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। তবে তারা বুঝতে পারছিলেন, প্যারিসের মতো দেশে এমন হত্যাকাণ্ড ঘটালে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ভয়াবহ হতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল, খোমেনি ক্ষমতায় গেলে ইরানের নীতি কী হবে, সেটি কেউ নিশ্চিতভাবে জানত না। মোসাদের কিছু কর্মকর্তা মনে করেছিলেন, নতুন সরকার হয়তো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পূর্ণ শত্রুতায় যাবে না। তাই ঝুঁকি নেওয়ার বদলে তারা পরিকল্পনাটি বাতিল করে। পরে সাবেক মোসাদ কর্মকর্তা ইয়োসি আলফারের স্মৃতিচারণে এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসে।

এখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যটি দেখা যায়। যে মোসাদ খোমেনিকে হত্যার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল, বহু দশক পরে ইসরায়েলি ও মার্কিন হামলায় আলি খামেনি নিহত হন। দুই হাজার ছাব্বিশ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। এই ঘটনা ইরান–ইসরায়েল সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কারণ এটি শুধু একজন নেতার মৃত্যু নয়, বরং পুরোনো নিরাপত্তা কাঠামোর ভেঙে পড়ার প্রতীক।

এবার আসা যাক বর্তমান পরিস্থিতিতে। দুই হাজার ছাব্বিশ সালের সাতই আগস্ট সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক মক্কায় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। চুক্তির মূল বক্তব্য হলো, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। তবে চুক্তিতে সামরিক প্রতিক্রিয়ার বিস্তারিত কাঠামো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এর বাস্তব বাধ্যবাধকতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।

এই চুক্তিতে তিনটি ভিন্ন ধরনের শক্তি এক জায়গায় এসেছে। পাকিস্তানের রয়েছে বড় সেনাবাহিনী এবং পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার। সৌদি আরব দিতে পারে বিপুল অর্থ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় মর্যাদা। তুরস্কের রয়েছে ন্যাটো অভিজ্ঞতা, বড় সামরিক বাহিনী এবং দ্রুত বাড়তে থাকা প্রতিরক্ষা শিল্প। তাই এই জোট শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা নয়। এটি অর্থ, সামরিক শক্তি, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত অবস্থানের সমন্বয়।

চুক্তিটি এমন সময়ে হয়েছে, যখন উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়েও তাদের আস্থা কমেছে। অতীতে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো ওয়াশিংটনের সামরিক ছাতার ওপর নির্ভর করত। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাত দেখিয়েছে, বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরতা সবসময় কার্যকর নাও হতে পারে। তাই সৌদি আরব নিজের নেতৃত্বে একটি আঞ্চলিক প্রতিরোধ কাঠামো গড়তে চাইছে।

তেহরানের চোখে এই জোটকে একটি সম্ভাব্য ঘেরাও হিসেবে দেখা স্বাভাবিক। ইরানের পূর্বে পাকিস্তান, উত্তরে তুরস্ক এবং পশ্চিমে সৌদি আরবের প্রভাব রয়েছে। তিন দেশ যদি একসঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়ায়, তাহলে ইরানের কৌশলগত চাপ বহুগুণ বাড়তে পারে। তেহরান এটিকে সুন্নি শক্তির সমন্বিত উত্থান হিসেবেও বিবেচনা করতে পারে। কারণ সৌদি আরব ও ইরান বহু বছর ধরে পশ্চিম এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় রয়েছে।

ইয়েমেনও এই হিসাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ইরানসমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। নতুন জোট শক্তিশালী হলে পাকিস্তান ও তুরস্ক থেকেও অস্ত্র, প্রশিক্ষণ এবং রসদ সরবরাহের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এতে ইয়েমেনের যুদ্ধ আরও জটিল হতে পারে। ইরানের ভয়, একটি আঞ্চলিক জোট তার মিত্রদের ওপর সমন্বিত চাপ তৈরি করবে।

ইসরায়েলও এই জোটকে পুরোপুরি স্বস্তির চোখে দেখছে না। তুরস্ককে ইসরায়েল এখন আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করে। আঙ্কারা হামাসের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন দেখিয়েছে বলে ইসরায়েল অভিযোগ করে। সিরিয়াতেও দুই দেশের স্বার্থ ক্রমশ মুখোমুখি হচ্ছে। ফলে জোটের ভেতরে তুরস্কের শক্তি বাড়লে ইসরায়েলের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলীয় নিরাপত্তা হিসাব বদলে যেতে পারে।

আজকের দর্শকের কাছে ইরান ও ইসরায়েলকে চিরশত্রু মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ইতিহাস বলছে, সম্পর্ক সবসময় এমন ছিল না। ইরান ছিল দ্বিতীয় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, যে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। উনিশশো পঞ্চাশ সালে তেহরান ইসরায়েলকে বাস্তবভিত্তিক স্বীকৃতি দেয়। দুই দেশের রাজধানীতে সীমিত কূটনৈতিক উপস্থিতিও ছিল। পরে তেহরানে ইসরায়েলের স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব তৈরি হয়।

শাহ আমলে ইরান ইসরায়েলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহকারী ছিল। উনিশশো সাতষট্টির আরব–ইসরায়েল যুদ্ধের পর আরব দেশগুলো তেল অবরোধ দিলে ইরানের গুরুত্ব বাড়ে। দুই দেশ এilat–Ashkelon বা ট্রান্স–ইসরায়েল তেল পাইপলাইন নির্মাণে সহযোগিতা করে। এর মাধ্যমে ইরানের তেল লোহিত সাগর থেকে ভূমধ্যসাগরে পৌঁছাত। ফলে সুয়েজ খাল ও আরব নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে ইউরোপে তেল পাঠানো সম্ভব হতো।

দুই দেশের সামরিক ও গোয়েন্দা সম্পর্ক ছিল আরও গভীর। মোসাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ ইরানের গোপন নিরাপত্তা সংস্থা সাভাক প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছিল। ইরানি কর্মকর্তারা ইসরায়েলে বিশেষ প্রশিক্ষণও পেয়েছিলেন। তখন দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে কয়েকটি হুমকি একই ছিল। এর মধ্যে ছিল আরব জাতীয়তাবাদ, সিরিয়া ও ইরাকের বাথবাদ এবং সোভিয়েত প্রভাব। এই অভিন্ন ভয়ই দুই দেশকে কাছে এনেছিল।

এই সহযোগিতার সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ছিল প্রজেক্ট ফ্লাওয়ার। উনিশশো সাতাত্তর থেকে উনিশশো ঊনআশি সাল পর্যন্ত চলা এই গোপন প্রকল্পে ইরান ও ইসরায়েল দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের পরিকল্পনা করেছিল। এটি ছিল তেল–বিনিময়ে অস্ত্র সহযোগিতার একটি অংশ। বিপ্লবের পর শাহের পতন হলে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। এই প্রকল্প দেখায়, আদর্শের চেয়ে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত স্বার্থ অনেক সময় বেশি শক্তিশালী হয়।

উনিশশো ঊনআশির ইসলামি বিপ্লব দুই দেশের সম্পর্ক পুরোপুরি বদলে দেয়। নতুন ইরানি সরকার ইসরায়েলবিরোধিতাকে রাষ্ট্রীয় আদর্শের কেন্দ্রে রাখে। তেহরান ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী ও লেবাননের হিজবুল্লাহকে সমর্থন দিতে শুরু করে। বিপরীতে ইসরায়েল ইরানকে নিজের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখতে থাকে। কয়েক দশকের পুরোনো সহযোগিতা দ্রুত সরাসরি শত্রুতায় পরিণত হয়।

এখানে মূল প্রশ্নটি দাঁড়ায়, জাতীয় স্বার্থ কি আদর্শকে হার মানাতে পারে? ইতিহাসে এমন উদাহরণ বহুবার দেখা গেছে। মিশর ও ইসরায়েল একসময় যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। তবুও উনিশশো ঊনআশি সালে তারা নিরাপত্তা চুক্তি সই করে। দুই হাজার বিশ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়। দুই হাজার তেইশ সালে সৌদি আরব ও ইরানও সমঝোতায় পৌঁছেছিল।

শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব রাজনীতিতেও অসম্ভব সমঝোতার নজির আছে। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরস্পরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। তবুও উনিশশো সাতাশি সালে তারা পারমাণবিক ও প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বড় শ্রেণি বিলুপ্ত করার চুক্তি করে। যুদ্ধের ক্লান্তি, নেতৃত্বের পরিবর্তন এবং পারস্পরিক নিরাপত্তা—সবকিছু মিলে সেই চুক্তি সম্ভব হয়েছিল।

তবে বর্তমান ইরানি শাসন ক্ষমতায় থাকলে ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো নিরাপত্তা চুক্তি প্রায় অসম্ভব। কারণ ইসরায়েলবিরোধিতা ইরানের বিপ্লবী রাষ্ট্রপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বা আইআরজিসি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছে। হামাস, হিজবুল্লাহ এবং অন্যান্য আঞ্চলিক গোষ্ঠীর প্রতি তেহরানের সমর্থনও এই বিরোধকে আরও গভীর করেছে।

তবুও ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ভবিষ্যতে বদলে যেতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষ প্রকাশ পেয়েছে। অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক দমন নিয়ে মানুষের ক্ষোভ রয়েছে। বাইরের সামরিক হুমকি কমে গেলে এসব অভ্যন্তরীণ বিরোধ আবার সামনে আসতে পারে। তখন কোনো জাতীয়তাবাদী সরকার পারস্য পরিচয়কে বিপ্লবী ইসলামি পরিচয়ের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে পারে।

একটি ভবিষ্যৎ জাতীয়তাবাদী সরকার ইরানের পারস্য ঐতিহ্যকে সামনে আনতে পারে। সেই সরকার সৌদি আরব ও তুরস্কের বাড়তে থাকা প্রভাবকে ভারসাম্য করার প্রয়োজন অনুভব করতে পারে। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা তখন আদর্শগত সমর্থন নয়, বরং কৌশলগত হিসাব হতে পারে। ইরান চাইতে পারে উন্নত প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা।

ইসরায়েলের জন্যও এই ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা পুরোপুরি অস্বাভাবিক নয়। তুরস্ক যদি নতুন জোটের সবচেয়ে সক্রিয় সামরিক শক্তি হয়ে ওঠে, তাহলে ইসরায়েল চাপ অনুভব করতে পারে। ইরানের সঙ্গে সরাসরি বন্ধুত্ব না হলেও গোয়েন্দা যোগাযোগ তৈরি হতে পারে। ইসরায়েল তখন ইরানের ভূগোল, জ্বালানি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগকে নিজের নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করতে চাইতে পারে।

ইরান ও ইসরায়েল কোনোদিন সমঝোতায় গেলে সেটি প্রকাশ্য সামরিক জোট নাও হতে পারে। প্রথম ধাপে গোপন গোয়েন্দা যোগাযোগ তৈরি হতে পারে। এরপর জ্বালানি, সাইবার নিরাপত্তা, সীমান্ত পর্যবেক্ষণ এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী মোকাবিলায় সীমিত সহযোগিতা হতে পারে। ইসরায়েল দিতে পারে বিমান প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি। ইরান দিতে পারে ভূগোল, জ্বালানি এবং বৃহৎ প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে গোপন যোগাযোগ নতুন কিছু নয়। প্রকাশ্যে নেতারা একে অপরকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করতে পারেন। কিন্তু পেছনে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সীমিত যোগাযোগ বজায় রাখতে পারেন। ইরান ও ইসরায়েলের ক্ষেত্রে এমন যোগাযোগ শুরু হলেও তা দ্রুত রাজনৈতিক স্বীকৃতিতে পরিণত হবে না। কারণ দুই দেশের জনগণ, সামরিক কাঠামো এবং ধর্মীয় রাজনীতির মধ্যে গভীর অবিশ্বাস রয়েছে।

এই সম্ভাবনার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হবে বিশ্বাসের সংকট। ইসরায়েল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র এবং আঞ্চলিক মিত্রদের ভয় পায়। ইরান ইসরায়েলের সামরিক হামলা, গুপ্তহত্যা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে হুমকি মনে করে। দুই পক্ষের সামরিক মতবাদ পরস্পরের বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছে। তাই একটি চুক্তি হলেও তার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

মক্কা চুক্তি এখনো কতটা কার্যকর সামরিক কাঠামো হবে, সেটি স্পষ্ট নয়। যৌথ মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং অস্ত্র সরবরাহের ব্যবস্থা তৈরি হলে জোটের গুরুত্ব বাড়বে। কিন্তু সদস্য দেশগুলোর জাতীয় অগ্রাধিকার এক নয়। সৌদি আরবের মূল চিন্তা উপসাগর ও ইয়েমেন। তুরস্কের লক্ষ্য বিস্তৃত আঞ্চলিক প্রভাব। পাকিস্তানের অগ্রাধিকার আবার নিজস্ব সীমান্ত ও অর্থনীতি।

মধ্যপ্রাচ্যের পুরোনো নিরাপত্তা কাঠামো এখন আর আগের মতো স্থির নেই। আগে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং কিছু আরব মিত্রকে কেন্দ্র করে একটি শক্তি কাঠামো দেখা যেত। এখন রাশিয়া, চীন, তুরস্ক, ইরান, সৌদি আরব এবং ইসরায়েল—সবাই আলাদা হিসাব করছে। ফলে স্থায়ী জোটের বদলে প্রয়োজনভিত্তিক সাময়িক জোট তৈরি হতে পারে।

ইরানের সামনে এখন দুটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথম পথ হলো, বিপ্লবী আদর্শ ধরে রেখে আঞ্চলিক প্রতিরোধ জোরদার করা। দ্বিতীয় পথ হলো, অর্থনৈতিক চাপ কমিয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। দ্বিতীয় পথ বেছে নিলে ইরান প্রতিবেশীদের সঙ্গে নতুন ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। তবে ইসরায়েলের সঙ্গে যেকোনো যোগাযোগকে তেহরানকে অত্যন্ত সতর্কভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

ইসরায়েলের জন্যও এই পরিস্থিতি একটি বড় শিক্ষা বহন করছে। সামরিক শক্তি দিয়ে প্রতিটি আঞ্চলিক সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করা যায় না। দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য রাজনৈতিক সমঝোতা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাস্তব যোগাযোগ প্রয়োজন। ইরানের ওপর ধারাবাহিক হামলা হয়তো সাময়িক সুবিধা দেবে। কিন্তু তা নতুন প্রতিশোধ, নতুন জোট এবং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

তাহলে ইরান ও ইসরায়েল কি আবার বন্ধু হতে পারে? নিকট ভবিষ্যতে প্রকাশ্য বন্ধুত্বের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। বর্তমান শাসনব্যবস্থা, সামরিক সংঘাত এবং জনগণের গভীর অবিশ্বাস সেই পথ আটকে রেখেছে। তবে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব বদলালে, আঞ্চলিক হুমকি বাড়লে এবং জাতীয় স্বার্থের চাপ তৈরি হলে সীমিত সমঝোতা অসম্ভব নয়। ইতিহাস এমন সম্ভাবনাকে একেবারে বাতিল করে না।

মোসাদের কাছে খোমেনিকে হত্যার অনুরোধ থেকে শুরু করে প্রজেক্ট ফ্লাওয়ার, তেল সহযোগিতা এবং বর্তমান সংঘাত—ইরান–ইসরায়েল সম্পর্কের ইতিহাস সরল নয়। এই ইতিহাস দেখায়, রাষ্ট্রগুলো স্থায়ী বন্ধুত্ব বা স্থায়ী শত্রুতার চেয়ে নিজেদের নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। সৌদি–পাকিস্তান–তুরস্ক জোট যদি শক্তিশালী হয়, তাহলে তেহরান ও জেরুজালেমের হিসাবও বদলাতে পারে। আজকের অসম্ভব শত্রু হয়তো আগামী দিনের সীমিত অংশীদার হতে পারে। তবে সেই পরিবর্তন আদর্শের কারণে নয়, বরং কঠিন জাতীয় স্বার্থের কারণে ঘটবে।

Walton Ads