এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক প্রকাশিত: ৩০ জুলাই, ২০২৫, ১০:০৭ পিএম

সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে মাইলস্টোন স্কুলের নিহত শিক্ষক মাহরীন চৌধুরী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি। এমন ভিডিও শনাক্ত করা অনেকের জন্যই কঠিন।
এই ভিডিওটি আইন বিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের মতো ব্যক্তিরাও শেয়ার করেছেন। পরে এটি এআই-নির্মিত বুঝে তিনি সরিয়ে ফেলেন। এমন ভিডিওর বাস্তবসদৃশ চেহারা সাধারণ মানুষের জন্য বিভ্রান্তিকর।
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো এআই ভিডিও ব্যবহার করে নিজেদের প্রচারণা চালাচ্ছে এবং প্রতিপক্ষকে হেয় করছে। এই ভিডিওগুলো সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, জনমতকে প্রভাবিত করছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব ৭০টি রাজনৈতিক এআই ভিডিও বিশ্লেষণ করেছে। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকরা প্রথমে এই প্রচারণা শুরু করে। পরে অন্য দলগুলোও যোগ দেয়।
এআই ভিডিও তৈরি করতে সময় ও খরচ কম লাগে। নির্বাচনি প্রচারণার তুলনায় এর প্রভাব অনেক বেশি। তবে, বাংলাদেশে এআই প্রযুক্তির বিকাশের তুলনায় এর সঠিক ব্যবহার শেখানো হয়নি।
এআই ভিডিওর মাধ্যমে নির্বাচনি এজেন্ডা ছড়ালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে বলে বিশ্লেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। এমন ভিডিও জনমনে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
সামাজিক মাধ্যমে সিঁদুর পরা নারী বা রিকশাচালকের ভিডিওতে নির্দিষ্ট দলের পক্ষে ভোট চাওয়া দেখা যায়। এগুলো সাধারণত আট সেকেন্ডের ছোট ভিডিও, যা গুগলের ভিও টুল দিয়ে তৈরি।
গুগলের ভিও টুল নির্দেশনা অনুযায়ী দুই-তিন মিনিটে ভিডিও তৈরি করতে পারে। এটি ব্যবহার করে ক্যারেক্টারের চেহারা, পোশাক, পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এর জন্য দামি ডিভাইসের প্রয়োজন নেই।
লার্নিং বাংলাদেশের ইন্সট্রাক্টর সাব্বির আহমেদ জানান, এআই ভিডিও এতটাই বাস্তবসদৃশ হচ্ছে যে অভিজ্ঞ ব্যক্তির পক্ষেও এগুলো শনাক্ত করা কঠিন। সঠিক নির্দেশনায় ভিডিওর গুণমান আরও উন্নত হয়।
একটি স্মার্টফোন দিয়েই এআই ভিডিও তৈরি সম্ভব। মাত্র দুই হাজার টাকায় হাজার ক্রেডিট কিনে ৫০টি ভিডিও বানানো যায়। কিছু ক্ষেত্রে বিনামূল্যেও এই টুল ব্যবহার করা যায়।
একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন নারী সাংবাদিক সিঁদুর পরা নারীকে ভোটের প্রশ্ন করছেন। উত্তরে তিনি জামায়াতের পক্ষে কথা বলেন। এই ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি এবং ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে।
আরেকটি ভিডিওতে রিকশাচালক বলছেন, তিনি জামায়াতের দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেবেন। ডিসমিসল্যাবের গবেষণায় দেখা গেছে, এই ভিডিওগুলো জামায়াতের সমর্থকরা তৈরি করেছে। তবে অন্য দলগুলোও এতে যোগ দিয়েছে।
বিএনপি, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনের সমর্থকরাও এআই ভিডিও তৈরি করছে। একটি ভিডিওতে শিক্ষার্থীরা ধানের শীষে ভোট দেওয়ার কথা বলেন। এমন ভিডিও জনমত গঠনে প্রভাব ফেলে।
এআই ভিডিওর গুণমান এতটাই উন্নত হচ্ছে যে শিক্ষিত মানুষের পক্ষেও এটি শনাক্ত করা কঠিন। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও একাধিকবার এমন ভিডিও শেয়ার করেছেন, পরে সরিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, মানুষ নিজেদের মতাদর্শের সাথে মিলে যাওয়া ফেক ভিডিও সহজেই গ্রহণ করে। এটি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ভিডিওগুলো ২ কোটি ৩০ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে। এতে ১০ লাখের বেশি রিঅ্যাকশন পড়েছে। এগুলো সমর্থন আদায় ও মানহানির লক্ষ্যে তৈরি।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই ভিডিওর বর্তমান চর্চা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। নির্বাচনের সময় এটি আরও তীব্র হবে। ভোটের আগে এমন ভিডিও দাঙ্গার কারণ হতে পারে, যেমনটি ইন্দোনেশিয়া ও ব্রাজিলে দেখা গেছে।
প্রযুক্তির বিকাশের সাথে জনসচেতনতা তৈরি না হওয়ায় এআই ভিডিও জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। নির্দিষ্ট এজেন্ডা নিয়ে ছড়ালে এটি বিশৃঙ্খলার কারণ হতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণ কঠিন।
এআই ভিডিওর মাধ্যমে সাধারণ প্রচারণার তুলনায় কম খরচে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। এটি জনমনে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে নির্বাচনের সময়।
বিশ্লেষকরা পরামর্শ দিচ্ছেন, নির্বাচনি প্রচারণায় এআই ব্যবহারের নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এছাড়া, গণমাধ্যম ও প্রযুক্তি বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা তৈরির কোনো বিকল্প নেই।