ঢাকা, শুক্রবার, এপ্রিল ৩, ২০২৬ | ২০ চৈত্র ১৪৩২
Logo
logo

পশ্চিমাদের চাপেও টলল না মোদি–পুতিন সম্পর্ক, বিশ্বকে দিলেন শক্ত বার্তা


এনবিএস ওয়েবডেস্ক   প্রকাশিত:  ০৬ ডিসেম্বর, ২০২৫, ০৪:১২ পিএম

পশ্চিমাদের চাপেও টলল না মোদি–পুতিন সম্পর্ক, বিশ্বকে দিলেন শক্ত বার্তা

পশ্চিমা বিশ্বের প্রবল চাপ, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শাস্তিমূলক শুল্ক, আর ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে চলমান কূটনৈতিক টানাপোড়েন—এসবের কিছুই ভারত–রাশিয়া সম্পর্কে সামান্যতম ফাটল ধরাতে পারেনি। নয়াদিল্লিতে বৈঠকে দাঁড়িয়ে ভ্লাদিমির পুতিন ও নরেন্দ্র মোদি বিশ্বকে জানিয়ে দিলেন—দুই দেশের সম্পর্ক আগের মতোই দৃঢ়, স্থিতিশীল এবং অটুট।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন বৃহস্পতিবার রাতে মাত্র ৩০ ঘণ্টার সফরে ভারতে আসেন। নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত রাশিয়া–ভারত বার্ষিক দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ সম্মেলনে দুই নেতা স্পষ্ট জানিয়ে দেন—সব বাহ্যিক চাপ উপেক্ষা করেই চলবে দুই দেশের বন্ধুত্ব।

‘শুকতারার মতো অবিচল’—মোদি, ‘চাপ ঠেকিয়ে সম্পর্ক মজবুত’—পুতিন

শুক্রবার মোদি বলেন, ভারত–রাশিয়া সম্পর্ক ‘শুকতারার মতো অবিচল’। পুতিনও প্রশংসা করেন মোদিকে—বলেন, তিনি বহিরাগত চাপ রুখে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করেছেন।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, বিমানবন্দরে প্রটোকল ভেঙে স্বয়ং মোদি গিয়েছিলেন পুতিনকে স্বাগত জানাতে। পরে দুই নেতা একই গাড়িতে করে যান প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে—এটিকে বলা হয় ‘লিমো কূটনীতি’।

বাণিজ্য, স্বাস্থ্য, জ্বালানি—চুক্তির বৃষ্টি

শীর্ষ সম্মেলন ঘিরে দুই দেশের মন্ত্রীদের মধ্যে একাধিক সমঝোতা স্মারক বিনিময় হয়েছে। জ্বালানি, কৃষি, ওষুধশিল্প, পরিবহনসহ নানা খাতে বাণিজ্য বাড়ানো হবে। মোদি জানান, এসব উদ্যোগ ২০৩০–এর অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রকল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

দুই দেশ ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের উচ্চাকাঙ্ক্ষী বাণিজ্য লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে।

পুতিন পরিষ্কার করে বলেন—"রাশিয়া ভারতকে নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ করতে প্রস্তুত"—এ কথা সরাসরি পশ্চিমাদের উদ্দেশ্যেই বার্তা।

মস্কোকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টার উত্তর দিলেন পুতিন

রাশিয়ার তেল কেনার কারণে ভারত–যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে। ওয়াশিংটন মনে করে, ভারত তেল কিনে পরোক্ষে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে অর্থায়ন করছে। এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫% শুল্ক বসিয়েছেন—মোট শুল্ক এখন ৫০%।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুতিন এই সফরের মাধ্যমে দেখাতে চান—রাশিয়া একা নয়, ক্রেমলিনকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব হয়নি।

ভারত–রাশিয়া সম্পর্ক ভাঙার কোনো পরিকল্পনা নেই—বিশ্লেষকরা

এ সম্মেলন শুধু বাণিজ্য নয়, রাজনৈতিক বার্তার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক হার্শ পান্ত বলেন—“দুই দেশের কারও সম্পর্ক দুর্বল করার কোনো ইচ্ছা নেই। সব চাপ উপেক্ষা করেই তারা স্থির থাকতে প্রস্তুত।”

তেল ও প্রতিরক্ষা ছাড়াও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও বৈচিত্র্যময় করার ওপর জোর দিয়েছে দুই দেশ।

পুতিন বলেন, দু’জনই নিয়মিত ফোনে কথা বলেন এবং দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্ব আরও গভীর করতে চান।

ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে চাপ দিল না ভারত

বিশ্ব আশা করেছিল, মোদি সম্ভবত পুতিনকে শান্তিচুক্তিতে রাজি করাতে চাপ দেবেন। কিন্তু ভারত তাদের আগের অবস্থানেই অটল—“এটা যুদ্ধের সময় নয়। ভারত শান্তির পক্ষে।”

মোদি বলেন, “বিশ্বকে শান্তির পথে ফেরার সময় এসেছে।”

পুতিনও প্রশংসা করে বলেন, মহাকাশ, সামরিক খাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নানা ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে রাশিয়া প্রস্তুত।

যুক্তরাষ্ট্র–রাশিয়া দুই দিকই সামলাতে কঠিন পথে ভারত

নয়াদিল্লি এখন জটিল এক ভূরাজনৈতিক সমীকরণের মধ্যে রয়েছে—
একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও শুল্ক বাড়ানো, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব রক্ষা।

১৯৬০–এর দশক থেকেই ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। শীতল যুদ্ধ শেষে মার্কিন সম্পর্ক বাড়ালেও রাশিয়ার ওপর সামরিকভাবে নির্ভরতা এখনো প্রবল। পাকিস্তানের সঙ্গে সাম্প্রতিক উত্তেজনার সময় ভারত রাশিয়ার এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ও সুখোই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুতিনকে নয়াদিল্লিতে আমন্ত্রণ জানানো ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের বড় উদাহরণ।

রাশিয়ার জ্বালানি কেনার অধিকার ভারতও রাখে—পুতিন

এক সাক্ষাৎকারে পুতিন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রও এখনো রাশিয়ার পারমাণবিক জ্বালানি কিনছে।
“তাহলে ভারতেরই বা কেন সেই অধিকার থাকবে না?”—প্রশ্ন করেন তিনি।

২০২২ সালের পর দুই দেশের বাণিজ্য ১০০০ কোটি ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৬,৯০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে—সস্তায় রুশ তেল আমদানি এর বড় কারণ।

শীর্ষ সম্মেলনে প্রতিরক্ষা ও ব্যবসায়ও বড় অগ্রগতি

পুতিনের সঙ্গে এসেছিলেন রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন্দ্রেই বেলুসোভ, রোসোবোরোন এক্সপোর্টের শীর্ষ কর্মকর্তাসহ বড় প্রতিনিধিদল।
বেলুসোভের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের বৈঠকে প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ উৎপাদন, স্বনির্ভরতা এবং নতুন প্রকল্পের আলোচনা হয়।

এ ছাড়া রাশিয়ার একটি দল ভারত থেকে মৎস্য ও মাংসজাত পণ্য আমদানির আগ্রহ দেখিয়েছে—বাজারে প্রবেশের বাধা দূর করতে চায় তারা।
গত বছর ভারত ৭৪৫ কোটি ডলারের মৎস্য রপ্তানি করেছে, যার মধ্যে ১২.৭ কোটি ডলার গেছে রাশিয়ায়।