ঢাকা, বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৬, ২০২৬ | ৩ বৈশাখ ১৪৩৩
Logo
logo

ভুয়া সমকামী পরিচয়ে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নিচ্ছেন অভিবাসীরা, তদন্তে বেরিয়ে এলো বড় প্রতারণা চক্র


এনবিএস ওয়েবডেস্ক   প্রকাশিত:  ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ০৩:০৪ পিএম

ভুয়া সমকামী পরিচয়ে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নিচ্ছেন অভিবাসীরা, তদন্তে বেরিয়ে এলো বড় প্রতারণা চক্র

সমকামী সেজে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় পেতে সহায়তা করার নামে হাজার হাজার পাউন্ড হাতিয়ে নিচ্ছে একটি বড় চক্র—এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে বিবিসির অনুসন্ধানে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব অভিবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষের পথে, তাদেরকে বানানো গল্প শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সাজানো প্রমাণ জোগাড় করতেও নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ভুয়া সমর্থনপত্র, ছবি এবং চিকিৎসা প্রতিবেদন।

এরপর তারা দাবি করছেন, নিজ দেশে—যেমন বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে—ফিরলে প্রাণনাশের ঝুঁকি রয়েছে। এই যুক্তিতে নিজেদের সমকামী পরিচয় তুলে ধরে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের আবেদন করছেন তারা।

বিবিসির এই অনুসন্ধানের পর যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তর সতর্ক করে বলেছে, যারা এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের আশ্রয় ব্যবস্থায় সাধারণত তাদের সুরক্ষা দেওয়া হয়, যারা নিজ দেশে ফিরে গেলে নির্যাতনের ঝুঁকিতে পড়বেন। বিশেষ করে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে সমকামিতা অবৈধ—সেখানে এই নিয়ম প্রযোজ্য।

তবে তদন্তে দেখা গেছে, কিছু আইন উপদেষ্টা ও সংস্থা এই ব্যবস্থাকে পদ্ধতিগতভাবে অপব্যবহার করছে। তারা অভিবাসীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে ভুয়া আশ্রয় আবেদন তৈরি করছে।

এই চক্রে জড়িতদের বেশিরভাগই আগে শিক্ষার্থী, কর্মী বা পর্যটক ভিসায় যুক্তরাজ্যে ছিলেন। তারা অবৈধ পথে আসা নতুন অভিবাসী নন। বর্তমানে মোট আশ্রয় আবেদনের প্রায় ৩৫ শতাংশই এই ধরনের, যার সংখ্যা ২০২৫ সালে এক লাখ ছাড়িয়েছে।

একটি আইন সংস্থা ভুয়া আশ্রয় আবেদন তৈরির জন্য সর্বোচ্চ সাত হাজার পাউন্ড পর্যন্ত নিচ্ছে। তাদের দাবি, এতে আবেদন বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা ‘খুবই কম’।

ভুয়া আবেদনকারীরা নিজেদের অসুস্থ দেখাতে চিকিৎসকদের কাছেও যাচ্ছেন। কেউ কেউ বিষণ্নতার ভান করছেন, আবার একজন নিজেকে এইচআইভি পজিটিভ বলেও মিথ্যা দাবি করেছেন—শুধু প্রমাণ জোগাড়ের জন্য।

একজন ইমিগ্রেশন উপদেষ্টা গর্ব করে জানিয়েছেন, তিনি ১৭ বছরের বেশি সময় ধরে এমন ভুয়া দাবি তৈরিতে সহায়তা করছেন। এমনকি তিনি সাজানো সমকামী সঙ্গী জোগাড় করেও দিতে পারেন বলে দাবি করেছেন।

বিবিসির আন্ডারকভার প্রতিবেদককে জানানো হয়, আশ্রয় পাওয়ার পর নিজের স্ত্রীকে পাকিস্তান থেকে নিয়ে আসা যাবে। এরপর তাকেও লেসবিয়ান হিসেবে সাজিয়ে আবার ভুয়া আবেদন করা সম্ভব।

আরেক আইনজীবী বলেন, তিনি ১৫০০ পাউন্ড ফিতে ভুয়া দাবি তৈরি করতে সাহায্য করেন, আর প্রমাণ জোগাড়ে লাগে আরও দুই থেকে তিন হাজার পাউন্ড।

পূর্ব লন্ডনের বেকটনের একটি শান্ত এলাকায় অবস্থিত একটি কমিউনিটি সেন্টারে ১৭৫ জনের বেশি মানুষ একটি সভায় অংশ নেন। সেখানে সাউথ ওয়েলস, বার্মিংহাম ও অক্সফোর্ড থেকেও লোকজন এসেছিলেন।

এই সভার আয়োজন করে উরচেস্টার এলজিবিটি নামের একটি সংগঠন, যারা নিজেদের সমকামী আশ্রয়প্রার্থীদের সহায়তাকারী গোষ্ঠী হিসেবে পরিচয় দেয়। যদিও তাদের ওয়েবসাইটে শুধু ‘প্রকৃত’ সমকামীদের জন্য বলা আছে, বাস্তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে।

সভায় অংশ নেওয়া ফাহার নামে একজন বলেন, “এখানে বেশিরভাগই সমকামী নয়।”
আরেকজন, নিজেকে জিশান পরিচয় দিয়ে বলেন, “এখানে কেউই আসল সমকামী নয়—এক শতাংশও না।”

এই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে প্রতিবেদক যোগাযোগ করেন ল অ্যান্ড জাস্টিস সলিসিটরস-এর প্যারালিগ্যাল মাজেদুল হাসান শাকিলের সঙ্গে। তিনি উরচেস্টার এলজিবিটির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যানও।

প্রথমে শাকিল বলেন, আশ্রয়ের জন্য নির্যাতনের বাস্তব আশঙ্কা থাকতে হবে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই তানিসা নামে একজন যোগাযোগ করেন, যিনি ভিন্ন পথ দেখান।

তিনি বলেন, “এখানে কেউই আসল নয়। বাঁচতে হলে এই পথই নিতে হবে।”
তিনি জানান, বানানো গল্প মুখস্থ করতে হবে এবং সাক্ষাৎকারে সেটি বিশ্বাসযোগ্যভাবে বলতে হবে।

তার মতে, সমকামী প্রমাণের কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষা নেই—সবকিছু নির্ভর করে আবেদনকারী কী বলছে তার ওপর। এজন্য ছবি, ক্লাব টিকিট, সমর্থনপত্রসহ একটি ‘সম্পূর্ণ প্যাকেজ’ তৈরি করা হয়।

তিনি আরও জানান, প্রয়োজন হলে এমন একজনকেও জোগাড় করা হবে, যিনি আবেদনকারীর সঙ্গে সম্পর্কের দাবি করবেন। এই সেবার জন্য তিনি আড়াই হাজার পাউন্ড দাবি করেন।

অন্যদিকে, কননাউট ল’-এর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আকিল আব্বাসি সাত হাজার পাউন্ড ফিতে একই ধরনের সহায়তার প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, প্রত্যাখ্যানের সম্ভাবনা খুব কম।

তিনি এমনকি সাজানো প্রমাণ হিসেবে ক্লাবের ছবি তোলার কথাও বলেন এবং আবেদনকারীকে পুরুষ সঙ্গী খুঁজে নিতে পরামর্শ দেন।

এদিকে লুটনভিত্তিক মুসলিম এলজিবিটি নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা এজেল খান জানান, অনেকেই তার কাছে সুপারিশপত্রের জন্য টাকা দিতে চাইলেও তিনি তা নেননি। তার সব কাজ স্বেচ্ছাসেবামূলক।

তিনি বলেন, অনেকেই সরাসরি স্বীকার করেছেন যে তারা সমকামী নন, কিন্তু যুক্তরাজ্যে থাকতে চান।

ঠিক কতগুলো আশ্রয় আবেদন ভুয়া, তা নির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে আশ্রয় চাওয়া পাকিস্তানি নাগরিকদের হার অনেক বেশি।

এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও ভারতের শিক্ষার্থী বা কর্মজীবী ভিসাধারীদের মধ্যেও এই প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে।