ঢাকা, বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ১৬, ২০২৬ | ৩ বৈশাখ ১৪৩৩
Logo
logo

বিদেশে জব্দ ইরানের শত বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্তির দাবি, আলোচনায় বড় চাপ সৃষ্টি করছে ইস্যুটি


এনবিএস ওয়েবডেস্ক   প্রকাশিত:  ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ০৩:০৪ পিএম

বিদেশে জব্দ ইরানের শত বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্তির দাবি, আলোচনায় বড় চাপ সৃষ্টি করছে ইস্যুটি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা ও সম্ভাব্য সমঝোতা আলোচনার মধ্যেই এখন সবচেয়ে বড় আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে বিদেশে আটকে থাকা তেহরানের বিপুল সম্পদ। নিষেধাজ্ঞার কারণে বছরের পর বছর ধরে এই অর্থ ব্যবহার করতে পারছে না ইরান।

মূলত ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র–এর সঙ্গে জিম্মি সংকটকে কেন্দ্র করে প্রথম নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়। পরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এই নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা হয়।

এর ফলে ইরানের তেল বিক্রির আয়সহ বহু অর্থ বিদেশি ব্যাংকে জমা থাকলেও তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

গত ১০ এপ্রিল পাকিস্তানে প্রথম দফার যুদ্ধবিরতি আলোচনার আগে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ দাবি করেন, আলোচনায় বসার আগে বিদেশে আটকে থাকা অর্থ মুক্ত করতে হবে।

পরদিন ইসলামাবাদে আলোচনার সময় কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র নাকি এসব সম্পদের কিছু অংশ ছাড়তে রাজি হয়েছে। তবে পরে ওয়াশিংটন স্পষ্টভাবে জানায়, কোনো সম্পদই এখনো মুক্ত করা হয়নি।

বর্তমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ২২ এপ্রিল শেষ হওয়ার আগে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা থাকায় এই ইস্যু আবারও কেন্দ্রবিন্দুতে আসছে।

কত টাকা আটকে আছে ইরানের?

বিশেষজ্ঞ ও সরকারি সূত্র অনুযায়ী, বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হতে পারে।

মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স–এর ফেলো ফ্রেডেরিক শ্নাইডার বলেন, এই অর্থ ইরানের বার্ষিক তেল–গ্যাস আয়ের প্রায় তিনগুণ।

তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা একটি দেশের জন্য এটি বিশাল অর্থনৈতিক সম্পদ। তবে এই অর্থ ছাড় পেলেও সেটি ব্যবহারে শর্ত থাকতে পারে।

২০১৬ সালে সাবেক মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি জ্যাকব লিউ জানিয়েছিলেন, নিষেধাজ্ঞা উঠলেও ইরান পুরো অর্থ ব্যবহার করতে পারবে না, কারণ এর বড় অংশ আগে থেকেই বিভিন্ন খাতে আটকে আছে।

বর্তমানে ইরানের প্রধান দাবি হলো অন্তত ৬ বিলিয়ন ডলার দ্রুত মুক্ত করা, যা আস্থার প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কীভাবে শুরু হয়েছিল এই জব্দের ইতিহাস?

১৯৭৯ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার প্রথম ইরানের সম্পদ জব্দ করেন। সেই সময় তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে ৬৬ জন মার্কিন নাগরিক জিম্মি ছিলেন।

১৯৮১ সালের আলজিয়ার্স চুক্তির মাধ্যমে কিছু অর্থ মুক্ত করা হয়। এরপর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আসে।

২০১৫ সালে জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (JCPOA) চুক্তির ফলে কিছু সম্পদ ফেরত পায় ইরান। কিন্তু ২০১৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালে আবারও নিষেধাজ্ঞা জোরদার হয়।

২০২৩ সালে বন্দি বিনিময় চুক্তির অংশ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে থাকা ৬ বিলিয়ন ডলার কাতারে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু পরে নতুন নিষেধাজ্ঞার কারণে সেই অর্থ আবারও আটকে যায়।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন-ও মানবাধিকার ও ইউক্রেন যুদ্ধ ইস্যুতে ইরানের কিছু সম্পদ জব্দ করেছে।

কোন কোন দেশে আটকে আছে ইরানের অর্থ?

ইরানি গণমাধ্যম অনুযায়ী—

জাপানে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার
ইরাকে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার
চীনে অন্তত ২০ বিলিয়ন ডলার
ভারতে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার
যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার
লুক্সেমবার্গে প্রায় ১.৬ বিলিয়ন ডলার
কাতারে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার (দক্ষিণ কোরিয়া থেকে স্থানান্তরিত)
কেন এই অর্থ এত গুরুত্বপূর্ণ?

দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি বড় সংকটে পড়েছে। তেল রপ্তানি কমেছে, শিল্প খাত পিছিয়ে গেছে, বিনিয়োগও কমেছে। পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে এবং রিয়ালের মান কমে গেছে, যার ফলে দেশজুড়ে বিক্ষোভও দেখা দিয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ১০০ বিলিয়ন ডলার ইরানের মোট জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশের সমান, যা অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রক্সান ফারমানফারমাইয়ান বলেন, এই অর্থ পেলে ইরান তেল আয়ের টাকা ফিরিয়ে আনতে, মুদ্রা স্থিতিশীল করতে এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতা কাটাতে পারবে।

তিনি আরও জানান, এই অর্থ দিয়ে তেলক্ষেত্র, পানি ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়ন সম্ভব। যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনেও এটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

ক্রিস ফেদারস্টোন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এই সম্পদ ছাড়ে, তাহলে তা আন্তর্জাতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দেবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, মার্কিন নীতির অনিশ্চয়তা ভবিষ্যতে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।