ঢাকা, শনিবার, এপ্রিল ২৫, ২০২৬ | ১২ বৈশাখ ১৪৩৩
Logo
logo

গায়েবি শক্তিতে থমকে গেল হরমুজ! ওমান পাশে থেকেও কেন অসহায়?


এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক     প্রকাশিত:  ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ০২:০৪ এএম

গায়েবি শক্তিতে থমকে গেল হরমুজ! ওমান পাশে থেকেও কেন অসহায়?

সমুদ্রের নীল জলরাশি, কিন্তু সেখানে কোনো ঢেউ নেই, আছে এক নিথর স্তব্ধতা। দিগন্তে সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বিশাল অয়েল ট্যাঙ্কার। হঠাৎ ক্যামেরার ফোকাস ঘুরে যায় তেহরানের সামরিক সদর দপ্তরের দিকে। পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে তাকালে ছোট্ট একটা জলপথ। নাম তার হরমুজ প্রণালী। কিন্তু এই এক চিলতে সমুদ্রপথই এখন বিশ্ব অর্থনীতির ভাগ্যবিধাতা। আবারও উত্তাল পারস্য উপসাগর। আবারও রণংদেহী ইরান।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে শুরু হওয়া দীর্ঘ স্নায়ুযুদ্ধের নতুন অধ্যায় রচিত হলো গত ১৮ই এপ্রিল। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে বদলে গেল বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ। ওমানের উপকূল হাতের নাগালে থাকলেও কেন সেখান দিয়ে জাহাজ যেতে পারছে না? কেন বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেলের ভাগ্য ঝুলে আছে ইরানের ইশারায়? আজ আমরা উন্মোচন করব হরমুজ প্রণালীর সেই অজানা রহস্য। কেন এই সংকীর্ণ জলপথটিই হয়ে উঠেছে আধুনিক পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর রণক্ষেত্র।

ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক আকস্মিক ঘোষণায় ইরানকে ‘পূর্ণ শক্তিতে নৌ অবরোধ’-এর হুমকি দেন। ট্রাম্পের দাবি ছিল, ইরানকে নতি স্বীকার করতে হবে। কিন্তু তেহরানের প্রতিক্রিয়ায় কেঁপে উঠল ওয়াশিংটন। সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেইয়ের নির্দেশে মুহূর্তের মধ্যেই বন্ধ করে দেওয়া হলো হরমুজ প্রণালী।

ইরানি সামরিক কমান্ডের বিবৃতিতে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, আমেরিকা যতক্ষণ না তাদের ওপর থেকে অন্যায্য নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করবে, ততক্ষণ এই জলপথ দিয়ে একটি জাহাজও নড়তে পারবে না। কিন্তু অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে—হরমুজ প্রণালী তো ১৬৭ কিলোমিটার লম্বা। এর একদিকে ইরান, অন্যদিকে ওমান। তাহলে ওমানের উপকূল দিয়ে কেন জাহাজ চলাচল করছে না?

রহস্যটা লুকিয়ে আছে সমুদ্রের গভীরতায়। ভূ-প্রকৃতি এখানে ইরানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। ওমান উপকূলের নাব্যতা অত্যন্ত কম। অর্থাৎ, সেখানে সমুদ্রের গভীরতা এতই অল্প যে বিশালকার মালবাহী জাহাজ বা অয়েল ট্যাঙ্কার চালানো অসম্ভব। তার ওপর রয়েছে জলের নিচে লুকিয়ে থাকা ধারালো এবং এবড়ো-খেবড়ো পাহাড়। সামান্য বিচ্যুতি মানেই জাহাজডুবি।

হরমুজ প্রণালীর ভেতর দিয়ে চলাচলের জন্য মাত্র দুটি সুনির্দিষ্ট লেন বা পথ রয়েছে। বিস্ময়কর তথ্য হলো, এই দুটি পথই পুরোপুরিভাবে ইরানের উপকূল ঘেঁষে তৈরি। প্রতিটি লেন মাত্র ৩ কিলোমিটার চওড়া। অর্থাৎ, ইরান চাইলে বাড়ির বারান্দায় বসে লাঠি হাতে পাহারাদারের মতো এই বিশ্ব বাণিজ্য পথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এটিই হলো ইরানের ‘অ্যাডভান্টেজ’। কয়েক দশক ধরে অনেক চেষ্টা করেও বিকল্প কোনো পথ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এই ৩ কিলোমিটারের সরু রাস্তাই এখন বিশ্বের গলার কাঁটা।

ইরানের এই একতরফা সিদ্ধান্তে রক্তচাপ বাড়ছে বিশ্বনেতাদের। এটি কোনো সাধারণ নৌ অবরোধ নয়; এটি সরাসরি বিশ্ব অর্থনীতির হৃৎপিণ্ডে আঘাত। ইরাক, কুয়েত, কাতার, বাহরিন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব—এই দেশগুলোর খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যের একমাত্র লাইফলাইন এই হরমুজ।

ইতিমধ্যেই এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাজারে। সংবাদসংস্থা রয়টার্সের তথ্যমতে, অবরোধের খবরের আগে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম কিছুটা কমলেও, অবরোধ ঘোষণার সাথে সাথেই পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। ব্যারেলপ্রতি দাম আবারও আকাশছোঁয়া হওয়ার অপেক্ষায়।

ভারত এই সংকটে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত। কারণ ভারতের জ্বালানি চাহিদার একটি বিশাল অংশ এই পথ দিয়েই আসে। মোদী সরকার ইতিমধ্যেই দুই পক্ষকে সংযত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি তো দূর, বরং অবনতি হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। ব্লুমবার্গের রিপোর্ট বলছে, ইতিমধ্যেই চারটি ভারতীয় এবং দুটি গ্রিক জাহাজ পথ হারিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে। এমনকি কয়েকটি ট্যাঙ্কার লক্ষ্য করে গুলি চালানোর খবরও পাওয়া যাচ্ছে। ট্রাম্প বনাম খামেনেই—এই দুই শক্তির লড়াইয়ে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ। তেলের দাম বাড়লে বাড়বে নিত্যপণ্যের দাম, বাড়বে মূল্যস্ফীতি। এক গভীর অন্ধকারের দিকে কি এগোচ্ছে বিশ্ব?

রাজনীতি যখন জেদ আর প্রতিশোধের খেলায় মেতে ওঠে, তখন তার খেসারত দিতে হয় গোটা পৃথিবীকে। ইরান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, তারা এক ইঞ্চিও ছাড় দেবে না। অন্যদিকে ট্রাম্পের একের পর এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

প্রশ্নটা এখন আর কেবল একটি জলপথের নয়। প্রশ্নটা সার্বভৌমত্বের, প্রশ্নটা শক্তির দাপটের। ওমান পাশে থাকলেও ভূ-প্রকৃতি ইরানকে যে ভৌগোলিক কবজ দিয়েছে, তার সামনে আপাতত অসহায় আধুনিক প্রযুক্তিও। হরমুজ প্রণালী কি তবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সলতে হয়ে উঠবে? নাকি শেষ মুহূর্তে কূটনৈতিক কোনো জাদুমন্ত্রে খুলবে এই রুদ্ধ দুয়ার?

সময়ের হাতেই তোলা থাক সেই উত্তর। তবে বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, পশ্চিম এশিয়ায় যে বারুদের স্তূপ তৈরি হয়েছে, তাতে একটি ছোট আগুনের ফুলকিই যথেষ্ট গোটা পৃথিবীকে ছারখার করে দিতে। আপনি কি মনে করেন? ট্রাম্পের চাপ নাকি ইরানের জেদ—কে জিতবে এই মরণ খেলায়? কমেন্ট করে আমাদের জানান।