ঢাকা, বুধবার, মে ২০, ২০২৬ | ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Logo
logo

চাকরির প্রলোভনে ইউক্রেন যুদ্ধে, রুশ বাহিনীতে বাংলাদেশিরা!


এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক     প্রকাশিত:  ১৯ মে, ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম

চাকরির প্রলোভনে ইউক্রেন যুদ্ধে, রুশ বাহিনীতে বাংলাদেশিরা!

আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার অসহায় মানুষদের উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানোর অভিযোগে রাশিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নতুন করে ৩৫টি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাজ্য।

এই তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশের নামও। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষকে প্রতারণার মাধ্যমে রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা হচ্ছে।

ব্রিটিশ সরকার বলছে, এসব মানুষকে কার্যত “কামানের খোরাক” হিসেবে ব্যবহার করছে মস্কো।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ২০২২ সাল থেকে অন্তত ২৭ হাজার বিদেশিকে এভাবে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে নামানো হয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে জনবলের চাহিদা বেড়েছে। আর সেই ঘাটতি পূরণে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে গড়ে তোলা হয়েছে একটি আন্তর্জাতিক নিয়োগ নেটওয়ার্ক—এমনটাই অভিযোগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর।

মঙ্গলবার, ৫ মে যুক্তরাজ্যের সরকার যে ৩৫টি নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে, তার মূল লক্ষ্য এই নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দপ্তরের মতে, রাশিয়া উন্নত জীবন, উচ্চ বেতন এবং বৈধ চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে অসংখ্য মানুষকে যুদ্ধে ঠেলে দিচ্ছে।

ব্রিটেনের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী Stephen Doughty এ কার্যক্রমকে “বর্বর” বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন,
“রাশিয়া দুর্বল ও অসহায় মানুষদের শোষণ করছে এবং তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে কামানের খোরাক হিসেবে ব্যবহার করছে।”

এই মন্তব্যের আগে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ফেডারেশনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালের পর থেকে অন্তত ২৭ হাজার বিদেশি নাগরিককে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিয়োগ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুসংগঠিত। প্রথমে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ইউরোপে চাকরি, স্টুডেন্ট ভিসা অথবা নিরাপত্তা খাতে উচ্চ বেতনের কাজের প্রলোভন দেখানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে বলা হয়, তারা রাশিয়ায় গিয়ে নির্মাণকাজ, কারখানা বা নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে কাজ করবেন।

কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয় এবং সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। এরপর স্বল্প প্রশিক্ষণ দিয়ে সরাসরি ইউক্রেনের সম্মুখযুদ্ধে পাঠানো হয়।

মানবাধিকার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এভাবে নিয়োগ পাওয়া বিদেশিদের প্রায় ২০ শতাংশ যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার প্রথম চার মাসের মধ্যেই নিহত হন। অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, দুর্বল সরঞ্জাম এবং কমান্ডারদের অবহেলাই এর প্রধান কারণ।

নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক শিক্ষক পোলিনা আজারনিখ। তার বিরুদ্ধে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে লোক নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া কিউবার নাগরিকদের প্রতারণার মাধ্যমে রাশিয়ায় পাঠানোর অভিযোগে এলেনা স্মিরনোভা এবং কিউবান নাগরিক ডায়ানা ইচেমেনদিয়া দিয়াজের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, নিষেধাজ্ঞার তালিকায় বাংলাদেশের নাম সরাসরি উঠে এসেছে।

সার্গেই মারজলিয়াকভ এবং সিরীয়-ইরাকি দ্বৈত নাগরিক আবিদ কালিদ শরিফ আবিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকেও মানুষ সংগ্রহ করে ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠিয়েছেন।

যুক্তরাজ্যের অভিযোগ অনুযায়ী, এই নেটওয়ার্ক শুধু যোদ্ধা সংগ্রহেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে Finland ও Poland-এ অস্থিরতা তৈরির ক্ষেত্রেও সহায়তা করেছে।

বাংলাদেশ থেকে কীভাবে মানুষ নিয়োগ করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা না হলেও ধারণা করা হচ্ছে, বিদেশে চাকরি ও উচ্চ আয়ের প্রলোভন দেখিয়ে দালালচক্র সম্ভাব্য প্রার্থীদের টার্গেট করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, বেকারত্ব এবং বিদেশে ভালো জীবনের স্বপ্নকে কাজে লাগিয়েই এসব নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়।

একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন বহু ভারতীয় নাগরিকও।

স্টুডেন্ট ভিসা অথবা রাশিয়ার নিরাপত্তা খাতে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভারত থেকে লোক নিয়োগের অভিযোগে পাঁচ ভারতীয় নাগরিকের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাজ্য।

তারা হলেন—ফয়সাল খান, দীপক পান্ডে, মনজিৎ সিং, রাকেশ পান্ডে এবং মোহাম্মদ দারাগুর।

এছাড়া তিনটি প্রতিষ্ঠানও নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে। এগুলো হলো—বাবা ভ্লগস ওভারসিজ রিক্রুটমেন্ট সলিউশনস, ওএসডি ব্রাদার্স ট্রাভেলস অ্যান্ড ভিসা সার্ভিসেস এবং অ্যাডভেঞ্চার ভিসা সার্ভিসেস।

ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এসব প্রতিষ্ঠান বৈধ ভিসা ও চাকরির সুযোগের কথা বলে মানুষকে আকৃষ্ট করত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের অনেককে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষ পাঠানো পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়।

জানা গেছে, আফ্রিকা ও এশিয়ার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে রাশিয়ার ড্রোন উৎপাদন কারখানায় কাজ করার জন্যও প্রলুব্ধ করা হচ্ছে।

বিশেষ করে তাতারস্তানে পরিচালিত ‘আলাবুগা স্টার্ট প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে বহু বিদেশিকে নিয়োগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের রাশিয়ায় প্রযুক্তি ও শিল্পখাতে কাজের সুযোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে তাদেরকে অস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়।

এই কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে ক্যামেরুনের নাগরিক মিশেল আতেবা এবং তার প্রতিষ্ঠান এনাঙ্গু হোল্ডিং-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাজ্য।

এছাড়া রাশিয়ার ড্রোন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত পাভেল নিকিতিনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তার কোম্পানি ভিটি-৪০ আক্রমণাত্মক ড্রোন তৈরি করে।

রাশিয়ার সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থায় সহায়তার অভিযোগে চীনের এম৯ লজিস্টিকস এবং থাইল্যান্ডভিত্তিক কানোপাস ট্রেডিং, তানাক ও সি ২ স্কাই নামের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের এই পদক্ষেপকে ইউক্রেন যুদ্ধকে ঘিরে পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ বৃদ্ধির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

লন্ডনের দাবি, রাশিয়া আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে শুধু অন্য দেশের ভূখণ্ডে যুদ্ধ চালাচ্ছে না, একই সঙ্গে বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে প্রতারণার মাধ্যমে এই সংঘাতে টেনে আনছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এসব নিয়োগ কার্যক্রম আধুনিক মানব পাচারের একটি নতুন রূপ।

এখানে মানুষকে কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদেশে নেওয়া হয়, এরপর জোরপূর্বক সামরিক কাজে নিযুক্ত করা হয়—যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নিষেধাজ্ঞা শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পদ জব্দ বা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং আন্তর্জাতিকভাবে এই নেটওয়ার্কের কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন করে তুলবে।

বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ, বিদেশে কাজের আশায় থাকা বাংলাদেশিদের একটি অংশ ভুয়া নিয়োগচক্রের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বিদেশে চাকরির প্রস্তাব পাওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই সরকারি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি এবং সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করা উচিত।

যুক্তরাজ্যের নতুন নিষেধাজ্ঞা সেই সতর্কবার্তাকেই আরও জোরালো করল।

ভালো চাকরি ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে যে প্রতারণার জাল বিস্তার করা হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে একটি যুদ্ধ অর্থনীতি—যেখানে মানুষের জীবনকে ব্যবহার করা হচ্ছে যুদ্ধের সরঞ্জাম হিসেবে।

আর সেই কারণেই ব্রিটেনের ভাষায়, এসব মানুষকে বানানো হচ্ছে “কামানের খোরাক”।