ঢাকা, শুক্রবার, মে ২২, ২০২৬ | ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
Logo
logo

যুদ্ধের মাঝেও আধুনিক নগরজীবন: কান্দাহার বিমানঘাঁটি যেন মরুভূমির বুকে এক স্বয়ংসম্পূর্ণ শহর


এনবিএস ডিজিটাল ডেস্ক     প্রকাশিত:  ২১ মে, ২০২৬, ০৫:০৫ পিএম

যুদ্ধের মাঝেও আধুনিক নগরজীবন: কান্দাহার বিমানঘাঁটি যেন মরুভূমির বুকে এক স্বয়ংসম্পূর্ণ শহর

যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত কান্দাহার বিমানঘাঁটি কেবল একটি সামরিক স্থাপনা নয়, বরং এটি এক পূর্ণাঙ্গ আধুনিক শহর। কঠোর নিরাপত্তা, উন্নত অবকাঠামো এবং যুদ্ধের প্রস্তুতির পাশাপাশি এখানে রয়েছে সৈন্যদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রায় সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা। রণক্ষেত্রের ঝুঁকি আর স্বাভাবিক জীবনের প্রয়োজন—দুইয়ের এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায় এই ঘাঁটিতে।

আফগানিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের সবচেয়ে অস্থিতিশীল এবং বিপজ্জনক দেশগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। দুই হাজার এক সালে আন্তর্জাতিক সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে দেশটিতে বহু বিদেশি সেনা সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। এমন এক পরিস্থিতির মধ্যেও দক্ষিণ আফগানিস্তানের কান্দাহার শহরের কাছে গড়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী সামরিক ঘাঁটি, যেখানে যুদ্ধের প্রস্তুতির পাশাপাশি বজায় রাখা হয়েছে আধুনিক নগরজীবনের প্রায় সব বৈশিষ্ট্য।

কান্দাহার শহর থেকে প্রায় বারো মাইল দূরে এবং রাজধানী কাবুলের দক্ষিণে অবস্থিত এই বিমানঘাঁটির আয়তন প্রায় দশ বর্গমাইল। এটি বর্তমানে উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোটের অন্যতম প্রধান বিমানঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এখান থেকেই পরিচালিত হয় আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে নজরদারি, পরিবহন এবং যুদ্ধ সহায়তা কার্যক্রমের বড় অংশ।

ঘাঁটির দায়িত্বে থাকা রয়্যাল বিমানবাহিনীর এয়ার কমোডর বব জাডসন নিজেকে এই বিশাল স্থাপনার ‘মেয়র’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, এটি শুধু একটি ঘাঁটি নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ শহর। এখানে রয়েছে দুই মাইল দীর্ঘ রানওয়ে, যা দিনরাত সচল থাকে। প্রতি মাসে প্রায় দশ হাজার বিমান ও হেলিকপ্টারের ওঠানামা হয় এই ঘাঁটিতে। ব্যস্ততার দিক থেকে এটি বিশ্বের বড় বেসামরিক বিমানবন্দরগুলোর সঙ্গেও তুলনীয়।

ঘাঁটির কেন্দ্রস্থলে রয়েছে সৈন্যদের বহুল পরিচিত এলাকা, যার নাম ‘বোর্ডওয়াক’। এটি মূলত একটি বাণিজ্যিক ও বিনোদন কেন্দ্র, যেখানে সৈন্যদের জন্য রয়েছে আন্তর্জাতিক খাবারের দোকান, গির্জা, সুপারমার্কেট, ব্যায়ামাগার এবং বিশাল খাবার পরিবেশন কেন্দ্র। প্রতিদিন প্রায় চৌদ্দ হাজার মানুষের খাবার প্রস্তুত করা হয় এখানে। পাশাপাশি একটি বৃহৎ লন্ড্রি কেন্দ্র প্রতিদিন প্রায় বারো টন কাপড় পরিষ্কার করে।

মরুভূমির প্রতিকূল পরিবেশে এসব সুবিধা সচল রাখা সহজ নয়। ঘাঁটির বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ লিটার জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। পানীয় জল সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

এই ঘাঁটিতে অবস্থানরত সৈন্যদের মধ্যে রয়েছেন বহু ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর সদস্য। জেআর-নাইন হ্যারিয়ার যুদ্ধবিমানের চালক রিচ হিলার্ড, যিনি সহকর্মীদের কাছে ‘বলি’ নামে পরিচিত, জানান যে কয়েক বছর আগেও এখানে জীবন ছিল অনেক বেশি কঠিন। তখন সৈন্যদের তাঁবুতে থাকতে হতো এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই দিন কাটাতে হতো। এখন উন্নত আবাসন, বিশ্রামাগার এবং বিনোদনের ব্যবস্থা থাকায় কর্মব্যস্ততার ফাঁকে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায়।

ঘাঁটিতে প্রায় নয়শ নারী সদস্যও কর্মরত আছেন। তাদের একজন একুশ বছর বয়সী ক্যাট, যিনি মানবসম্পদ বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। তার কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সৈন্যদের কাছে পরিবার-পরিজনের পাঠানো চিঠি ও পার্সেল পৌঁছে দেওয়া। প্রতিদিন কয়েক বস্তা ডাক আসে, যা দূরে থাকা সৈন্যদের জন্য মানসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই বিশাল ঘাঁটির অভ্যন্তরে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও কঠোর নিয়ম রয়েছে। সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় দশ মাইল নির্ধারণ করা হয়েছে এবং সামরিক পুলিশ নিয়মিত তা তদারক করে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি পদক্ষেপে সতর্কতা বজায় রাখা হয়।

তবে সব আধুনিক সুবিধার মধ্যেও যুদ্ধের বাস্তবতা এখানে সবসময় স্পষ্ট। তালেবান যোদ্ধারা প্রায় প্রতি সপ্তাহে এক বা দুইবার এই ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালায়। বিশেষ দিবস বা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হামলার আশঙ্কা আরও বেড়ে যায়। বিপদ সংকেত বাজলেই সবাইকে দ্রুত সুরক্ষা সরঞ্জাম পরে বাঙ্কারে আশ্রয় নিতে হয়।

ঘাঁটির বাইরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে টহল দেয় বিমানবাহিনীর বিশেষ রেজিমেন্ট। এলাকায় মাইন বিস্ফোরণ এবং অতীত যুদ্ধের অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের ঝুঁকি রয়েছে। সম্প্রতি কয়েকজন সদস্য নিহত হওয়ার পর অতিরিক্ত সুরক্ষার জন্য বিশেষভাবে নির্মিত বিস্ফোরণ প্রতিরোধী সাঁজোয়া যান আনা হয়েছে।

এই ঘাঁটিতে দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়মিত নতুন সেনা সদস্য আসেন। যুক্তরাজ্যের সাফোক অঞ্চল থেকে আগত অনেক সেনা ছয় মাসের জন্য এখানে মোতায়েন হন। তাদের মধ্যে কেউ পরিবার, কেউ অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বা বাগদত্তাকে রেখে আসেন। বিদায়ের মুহূর্তে আবেগঘন দৃশ্য তৈরি হয়, কারণ প্রত্যেকেই জানেন সামনে অপেক্ষা করছে অনিশ্চিত এক সময়।

প্রথমবার দায়িত্বে আসা তরুণ সৈন্যদের কাছে অভিজ্ঞতাটি আরও গভীর। গলায় ঝোলানো পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে তারা উপলব্ধি করেন যে এখন তারা এমন এক যুদ্ধে অংশ নিতে যাচ্ছেন, যেখানে জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান কখনো কখনো মাত্র কয়েক সেকেন্ডের।

কান্দাহার বিমানঘাঁটির কার্যক্রম শুধু সামরিক অভিযানে সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জনের লক্ষ্যে এখানে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমও পরিচালিত হয়। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি বিপজ্জনক পথ অতিক্রম করে একটি বিশাল টারবাইন কজ্জাকী বাঁধে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আফগানিস্তানের প্রায় এক লাখ পরিবারের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে।

এই অভিযানের আকাশ নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন পাইলট রিচ হিলার্ড। তিনি যুদ্ধবিমান থেকে উন্নত পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিচের পরিস্থিতি নজরদারি করেন এবং প্রয়োজন হলে স্থলবাহিনীকে সহায়তা দেন। তার মতে, এমন মিশনের উদ্দেশ্য কেবল সামরিক সাফল্য নয়; বরং স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।

কান্দাহার বিমানঘাঁটির জীবন এক বৈপরীত্যের প্রতিচ্ছবি। একদিকে রয়েছে আন্তর্জাতিক খাবারের দোকান, ব্যায়ামাগার ও বিশ্রামকেন্দ্র; অন্যদিকে রয়েছে রকেট হামলার সতর্ক সংকেত, বাঙ্কারে আশ্রয় এবং প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ঝুঁকি। সৈন্যদের কাছে এটি একই সঙ্গে দায়িত্ব, ত্যাগ এবং বেঁচে থাকার সংগ্রামের স্থান।

অনেকের ভাষায়, যুদ্ধের এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও কান্দাহার বিমানঘাঁটি যেন এক টুকরো স্বাভাবিক জীবন। কয়েক মাসের দায়িত্ব শেষে যখন তারা দেশে ফেরার বিমানে ওঠেন, তখন চোখেমুখে ফুটে ওঠে স্বস্তি, অর্জনের তৃপ্তি এবং প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাওয়ার গভীর আকাঙ্ক্ষা।

আফগানিস্তানের অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে কান্দাহার বিমানঘাঁটি তাই শুধু একটি সামরিক ঘাঁটির নাম নয়; এটি যুদ্ধের মাঝেও স্বাভাবিক জীবন ধরে রাখার এক অসাধারণ প্রচেষ্টার প্রতীক।