২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির রাত। টিভির স্ক্রিনে চোখ আটকে আছে লাখ লাখ মানুষের। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল আসছে একের পর এক। দেশজুড়ে উত্তেজনা তুঙ্গে। কোথাও উল্লাসের ঢেউ, কোথাও হতাশার ছায়া। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে যা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ল, তা হলো গণতন্ত্রের সত্যিকারের উৎসব।

দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশের মানুষ পেল অবাধ, শান্তিপূর্ণ আর উৎসবমুখর ভোটের স্বাদ। এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের স্বপ্ন অনেকদিন ধরেই দেখছিল সবাই। অবশেষে এই ফেব্রুয়ারিতে সেই স্বপ্ন সত্যি হলো। জনগণ পেল সত্যিকারের নির্বাচিত সরকার। আর সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী হলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

তারেক রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে বিএনপি এবার এককভাবে ২১২ আসনে ভূমিধস জয় পেয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক দলসহ আন্তর্জাতিক মহল এই নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইইউ পর্যবেক্ষকরা বলেছেন, নির্বাচন ছিল অবাধ এবং বিশ্বাসযোগ্য। কোনো জালিয়াতি বা কারচুপির ঘটনা চোখে পড়েনি।

আওয়ামী লীগের পতনের আগের সরকারের আমলে পরপর তিনটি নির্বাচনে ভোট দিতে না পেরে মানুষ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছিল। ২০১৪-এর ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮-এর রাতের ভোট আর ২০২৪-এর প্রহসন—এসবের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসন চলছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানে সেই সরকারের পতন ঘটে। আর এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে ফিরে এসেছে গণতান্ত্রিক ধারা।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আর তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান সত্যিকারের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। কিন্তু তার এই পথ মোটেও সহজ ছিল না।
দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে, কণ্টকাকীর্ণ রাজনৈতিক পথ পাড়ি দিয়ে তিনি আজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। নির্বাসনে থেকেও দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে তিনি অবিরাম লড়াই করেছেন। তার ফলেই ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান হয়েছে আর সম্প্রতি অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হয়েছে।
তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর। এমন এক পরিবারে বড় হয়েছেন যেখানে নৈতিক মূল্যবোধ ছিল সবচেয়ে বড়। সেই মূল্যবোধ আজও তার জীবনে ঝলমল করে।

১৯৮৮ সালে গাবতলী উপজেলা বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হয়ে রাজনীতিতে পা রাখেন। গাবতলী তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান, বগুড়ায়।
১৯৯৩ সালে বগুড়া জেলা বিএনপির সদস্য হন। ১৯৯১-এর নির্বাচনে মায়ের পাঁচ আসনের প্রচারণা সমন্বয় করেন। মায়ের নিরঙ্কুশ জয় প্রমাণ করে তিনি দক্ষ সংগঠক।

শৈশব থেকেই দেশ ও জনগণের কল্যাণে রাজনীতি শিখেছেন। মা খালেদা জিয়ার ত্যাগ, উদারতা আর এরশাদের বিরুদ্ধে লড়াই দেখেছেন কাছ থেকে। বাবা-মায়ের কাছ থেকে পেয়েছেন আদর্শ রাজনৈতিক মূল্যবোধ।

২০০১-এর নির্বাচনেও প্রচারণার দায়িত্ব পালন করেন। ধানের শীষের পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়। ২০০২ সালে স্থায়ী কমিটি তাকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব করে।
কিন্তু রাজনীতিতে উঠতে উঠতেই শুরু হয় ষড়যন্ত্র। ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্রদের ষড়যন্ত্রে পড়েন। নির্যাতন, কারাগার, মেরুদণ্ডের আঘাত—সব সহ্য করে লন্ডনে চিকিত্সা নেন। বাধ্য হয়ে নির্বাসন বেছে নেন।

কিন্তু তার মনোবল ভাঙেনি। যুক্তরাজ্য থেকে অনলাইনে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে লড়াই চালিয়ে গেছেন। হাসিনা সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে ১৭টি মিথ্যা মামলা দায়ের হয়। জিয়া পরিবারকে হয়রানি করতে সেনানিবাসের বাড়ি ভেঙে দেয়া হয়। তবু তার জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে।
২০১৮ সালে মা খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে তাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করা হয়। তার প্রজ্ঞা আর নেতৃত্বের জন্যই এ পদ পান। নির্বাসনে থেকেও গণতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যান।

তার আহ্বানে জাতি জেগে ওঠে। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
এরপর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান বীরের মতো দেশে ফেরেন। খালি পায়ে মাটি ছুঁয়ে বলেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান ফর দ্য পিপল অ্যান্ড ফর দ্য কান্ট্রি।’

দেশে ফেরার পাঁচ দিন পর মা খালেদা জিয়া মারা যান। ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি দলের চেয়ারম্যান হন।
তার উত্থান উত্তরাধিকার নয়, নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা, নিষ্ঠা আর পরিশ্রমের ফল। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন—অপশাসন, নিপীড়ন থেকে দেশকে বের করে আনবেন। জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দেবেন।
আজ বাংলাদেশ আবার গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে উঠে দাঁড়িয়েছে। তারেক রহমানের হাত ধরে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে।

 

news