ঐতিহাসিক মোড়! শেখ হাসিনার পতনের পর দিল্লি নয়, ইসলামাবাদ নয়—বাংলাদেশ এখন নিজের পথে, কাদেরের ছেলে তারেক রহমানের সাহসী ঘোষণায় তোলপাড় দক্ষিণ এশিয়া
গণঅভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর পর বাংলাদেশের মানুষ দিল এক ঐতিহাসিক নির্বাচনী রায়। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, সেই ধোঁয়াশা কাটিয়ে অবশেষে নতুন নেতৃত্বে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার ম্যান্ডেট পেলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আর তাঁর প্রথম বার্তাটাই যেন চমকে দিল গোটা দক্ষিণ এশিয়াকে—'বাংলাদেশ কারও ছায়ায় নয়, নিজের স্বার্থেই চলবে।'
শেখ হাসিনার পতন থেকে নির্বাচনী রায়
২০২৪ সালে বিক্ষোভকারীদের ওপর দমনপীড়নের ঘটনায় প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হন। সেই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পর চূড়ান্ত পতন ঘটে শেখ হাসিনা সরকারের। দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা এই নেত্রী দেশ ছেড়ে দিল্লিতে আশ্রয় নেন। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর অনুপস্থিতিতেই বিচার শেষ হয় এবং তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে ভারত তাঁকে প্রত্যর্পণ না করায় দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন তৈরি হয়।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক: সমর্থন নাকি একপাক্ষিক নির্ভরতা?
ক্ষমতায় থাকাকালে শেখ হাসিনা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখলেও বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ছিল। আঞ্চলিক কূটনীতিতে তাঁর সরকার ভারতের দিকে বেশি ঝুঁকেছিল—১৫ বছরে সাতবার দিল্লি সফর তার প্রমাণ। নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ে, ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া হয়, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান নজিরবিহীন মাত্রায় পৌঁছায়। তবে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি অমীমাংসিতই থেকে যায়, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়নি। জ্বালানি খাতে ভারতীয় বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ে। বড় প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সমর্থকদের কাছে এটি ছিল বাস্তববাদী কূটনীতি, সমালোচকদের কাছে একপাক্ষিক নির্ভরতা।
ইসলামাবাদের সঙ্গে নতুন সমীকরণ
ক্ষমতায় ফেরার পর তারেক রহমানের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ—ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়া। এক সমাবেশে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলে দেন, "নট দিল্লি, নট পিণ্ডি—বাংলাদেশ সবার আগে। বাংলাদেশ কারও পিছনের উঠান নয়।" শেখ হাসিনার বিদায়ের পর অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে। ১৪ বছর পর করাচিতে সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়। ১৩ বছর পর পাকিস্তানি মন্ত্রীরা সফরে আসেন। সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা আবার শুরু হয়। দুই দেশের বাণিজ্য ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
জনমত ও নতুন বাস্তবতা
এখনো দেশে ভারতবিরোধী মনোভাব রয়েছে। অনেকের চোখে ভারত বহিরাগত প্রভাবের প্রতীক। তবে বাস্তবতা একমুখী নয়—বাণিজ্য, জ্বালানি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তা অনেকে স্বীকার করেন। তারেক রহমান ইতোমধ্যে দিল্লি ও ইসলামাবাদ—দুই দিক থেকেই শুভেচ্ছা বার্তা পেয়েছেন। তবে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণে ভারতের অস্বীকৃতি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ইস্যু হয়ে আছে।
দিল্লিভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের বিশ্লেষক স্মৃতি পট্টনায়ক বিবিসিকে বলেন, "শেখ হাসিনার আমলে দোলক ভারতের দিকে বেশি ঝুঁকেছিল, এখন উল্টো দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ার ঝুঁকি আছে।"
সামনে কোন পথে বাংলাদেশ?
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নির্বাচনী রায় দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন ভাবনার দরজা খুলেছে। বাংলাদেশ আর কারও প্রভাবে নয়, নিজস্ব স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেবে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হবে একক নির্ভরতা এড়িয়ে বহুমুখী সম্পর্ক গড়া এবং ঢাকার কণ্ঠস্বরকে আরও দৃঢ় করা। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই চীনের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। নতুন নেতৃত্বে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় আরও আত্মবিশ্বাসী ও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
