ম্যাঞ্চেস্টারে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চতুর্থ টেস্টে ভারতের দুর্দান্ত কামব্যাকের অন্যতম নায়ক হয়ে উঠেছেন অলরাউন্ডার ওয়াশিংটন সুন্দর। টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি করে শুধু দলকে পরাজয় থেকে বাঁচিয়েই দেননি, বরং আবারও নিজের প্রতিভার জানান দিয়েছেন আন্তর্জাতিক মঞ্চে।
২৫ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার রাবীন্দ্র জাদেজার সঙ্গে মিলে ২০৩ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়েন পঞ্চম দিনে। সুন্দর অপরাজিত থাকেন ১০১ রানে, খেলেন ২০৬ বল। তাঁর ইনিংসে ছিল ৯টি চার ও একটি ছয়।
এই দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি লর্ডস টেস্টেও বল হাতে চমক দেখিয়েছেন তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ২২ রানে ৪ উইকেট নেন এই অফ-স্পিনার। তিন টেস্টে তাঁর রান সংখ্যা দাঁড়ায় ২০৫, এবং উইকেট ৭টি।
আইপিএল ও ঘরোয়া ক্রিকেটে অবহেলা?
ওয়াশিংটনের এই দুর্দান্ত ফর্মের পরও তাঁর বাবা মনে করছেন, আরসিবি-সহ আইপিএলের দলগুলো তাঁর ছেলেকে সঠিকভাবে সুযোগ দেয়নি। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু (আরসিবি)-র হয়ে খেললেও মাত্র ৩১টি ম্যাচে মাঠে নামেন সুন্দর।
এই চার মৌসুমে সুন্দর ব্যাট হাতে করেন মাত্র ২০৮ রান, গড় ১৩.৮৬ এবং স্ট্রাইক রেট ১১৩.৮৬। তবে বল হাতে ৭.১৭ ইকোনমিতে ১৯টি উইকেট নেন, যার অধিকাংশই পাওয়ার প্লেতে। তবুও তাঁকে নিয়মিত খেলানো হয়নি।
ওয়াশিংটনের বাবা জানান, “আমার ছেলে টানা ১১ ম্যাচে বাদ ছিল। অথচ সে নিজের প্রথম ম্যাচেই ১৪ বলে ৪০ রান করেছিল সানরাইজার্স হায়দরাবাদের হয়ে। পরের ম্যাচে তাকে নামানো হয় ছয় নম্বরে।”
নিদাহাস ট্রফিতে অবদানের কথা স্মরণ
২০১৭-১৮ সালের নিদাহাস ট্রফিতেও ওয়াশিংটনের ছিল অসাধারণ পারফরম্যান্স। পাঁচ ম্যাচে তিনি নেন ৮টি উইকেট, গড় ১৪.২৫ এবং ইকোনমি মাত্র ৫.৭০। এই সাফল্যের কারণে তাকেই প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট ঘোষণা করা হয়।
ওয়াশিংটনের বাবা বলেন, “এমন পারফর্ম করার পরও তাঁকে নিয়মিত দলে রাখা হয়নি। এমনকি বর্তমান দল গুজরাট টাইটান্সও তাঁকে ধারাবাহিকভাবে সুযোগ দেয় না।”
আইপিএল ২০২৫-এ টাইটান্সের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস
আইপিএল ২০২৫-এর এলিমিনেটরে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের বিপক্ষে ২৪ বলে ৪৮ রানের ইনিংস খেলেন সুন্দর। তাঁর ব্যাটিংয়ের ওপর নির্ভর করেই দল বড় লক্ষ্য তাড়ায় অনেক দূর এগিয়ে যায়। কিন্তু জসপ্রিত বুমরাহর নিখুঁত ইয়র্কারে আউট হলে ম্যাচ হাতছাড়া হয় টাইটান্সের।
ওই মৌসুমে পাঁচ ম্যাচে তাঁর রান ছিল ১১৪, গড় ২৬.৬০ এবং স্ট্রাইক রেট ছিল চমৎকার ১৬৬.২৫।
ঘরোয়া ক্রিকেটেও উপেক্ষিত সুন্দর?
ওয়াশিংটনের বাবা আক্ষেপ করে বলেন, “রাজস্থান রয়্যালস যেভাবে যশস্বী জয়সওয়ালকে সুযোগ দিয়েছে, আমার ছেলেকে তেমনভাবে কেউ ব্যাক করেনি। এমনকি ঘরোয়া ক্রিকেটেও সুন্দরকে ধারাবাহিক সুযোগ দেওয়া হয় না।”
তিনি আরও যোগ করেন, “ওয়াশিংটন যদি এক-দুই ম্যাচে ব্যর্থ হয়, সঙ্গে সঙ্গেই বাদ পড়ে যায়। অথচ ২০২১ সালে চেন্নাই টেস্টে টার্নিং উইকেটে অপরাজিত ৮৫ এবং আহমেদাবাদে ৯৬* রানের ইনিংস খেলেছে। তবুও সেগুলো মনে রাখেন না কেউ।”
২০২১ গাব্বা টেস্টে নজরকাড়া অভিষেক
ওয়াশিংটনের টেস্ট অভিষেক হয়েছিল ২০২১ সালে, সেই ঐতিহাসিক গাব্বা টেস্টে। সেখানে তিনি করেছিলেন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া হাফসেঞ্চুরি। এরপর থেকে সীমিত সুযোগেও বারবার প্রমাণ করেছেন নিজের সামর্থ্য।
তবে বাবার মতে, তাঁর পারফরম্যান্স বারবার উপেক্ষিত হয়েছে, “যদি ওই দুই ইনিংস শতকে রূপ নিত, তাহলেও হয়তো বাদ পড়ত। ভারতীয় ক্রিকেটে আর কোনো খেলোয়াড়ের জন্য কি এমন ব্যবহার করা হয়?”
এখনই সময় ওয়াশিংটনের জন্য ধারাবাহিক সুযোগের
বর্তমান ফর্মে ওয়াশিংটন সুন্দরকে এখন ভারতের মিডল অর্ডারে ধারাবাহিকভাবে খেলানো উচিত। বাবার বক্তব্য, “সে যেন টেস্টে পাঁচ নম্বরে ধারাবাহিকভাবে খেলার সুযোগ পায়। অন্তত পাঁচ থেকে দশটি ম্যাচ নিয়মিত খেলাতে হবে।”
ম্যানচেস্টারের মতো সেঞ্চুরি শুধু নয়, ওয়াশিংটনের এমন আরও অনেক ইনিংস ভারতীয় ক্রিকেটকে উপহার দেওয়ার ক্ষমতা আছে, যদি তাঁকে উপযুক্তভাবে পরিচালনা করা হয়। দল নির্বাচনের সময় শুধুমাত্র ফর্ম নয়, প্রতিভার মূল্যায়ন করা সময়ের দাবি।
