ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে একটি ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। এই ভাইরাস ধরা যায় না, হাত ফসকে যায়। কি সেই ভাইরাস? বোঝা যাচ্ছে না তো? এর নাম ‘ক্যাচ ড্রপ ভাইরাস’, যা চলতি আইপিএলে দৃষ্টিকটু হয়ে উঠছে। প্রত্যেকটি ম্যাচেই বড় সুযোগ হাত ফসকে যাচ্ছে, ম্যাচের ভাগ্যও পাল্টে দিচ্ছে।
ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাসের সবশেষ উদাহরণ পাঞ্জাব কিংস ও দিল্লি ক্যাপিটালসের ম্যাচ। অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে স্বাগতিকরা ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসের অন্যতম সর্বোচ্চ সংগ্রহ ২৬৪ রান তোলে।
ইনিংসের তৃতীয় ওভারে লোকেশ রাহুলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ ফেলে দিল্লি। লেগ সাইড বাউন্ডারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন শশাঙ্ক সিং, সোজাসুজি আসা ক্যাচ নিতে ব্যর্থ হন, বল পড়ে যায় তার হাত থেকে।
রাহুল জীবন পেয়ে পাঞ্জাবের ওপর চড়াও হন। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে ভারতীয় হিসেবে সর্বোচ্চ ১৫২ রান করেন। শশাঙ্ক হাঁচি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানে ক্যাচ ফেলার পরপরই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে। দিল্লি একই সন্ধ্যায় ছয়-ছয়টি ক্যাচ ফেলে। এর মধ্যে একটি ছিল ম্যাচের মোড় ঘুরানো মুহূর্ত। ১৫তম ওভারে শ্রেয়াস আইয়ার লং অফে করুণ নায়ারের হাত ফসকে জীবন পান। তারপর ভারতীয় ব্যাটার আইপিএলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড গড়ে এবং অপরাজিত থাকেন আইয়ার।
দিল্লি বনাম পাঞ্জাব ম্যাচেই শুধু নয়। গতকাল অনুষ্ঠিত দুই ম্যাচে ১৭টি ক্যাচ পড়েছে। রাজস্থান ও হায়দরাবাদের পরের ম্যাচে অগুণতি ক্যাচ ড্রপ হয়েছে। ম্যাচটি সহজেই জিতে যায় হায়দরাবাদ।
করুণ নায়ার, শশাঙ্ক সিংয়ের সঙ্গে কাঠগড়ায় লুঙ্গি এনগিডি। পেছনে ফিরে ক্যাচ নিতে গিয়ে মাটিতে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘান পান দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটার। ‘ক্যাচ মিস তো ম্যাচ মিস’—এই প্রবাদ অক্ষরে অক্ষরে ফলছে।
এই ক্যাচ ড্রপ ভাইরাস নতুন কিন্তু নয়। ২০২০ থেকে ক্যাচিংয়ের দক্ষতা হ্রাস পেতে শুরু করেছে। ২০২০ সালে আইপিএলে ১০০ ক্যাচের মধ্যে ৮৫টিতে আউট হয়েছে। সেই সংখ্যা ২০২৫ সালে এসে কমে দাঁড়িয়েছে ১০০ তে ৭৬। এই বছর তো সেই সংখ্যা আরও নিচের দিকে নামতে যাচ্ছে।
এই পরিসংখ্যান বুঝিয়ে দিচ্ছে, ফ্লাডলাইটের নিচে শুধু ভাগ্য বিরুদ্ধে যাচ্ছে, তা নয়। এটা একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এমন এক যুগে ক্রিকেট এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে খেলোয়াড়রা আরও বেশি ক্ষিপ্র, ফিট এবং আরও প্রশিক্ষিত। তারপরও ক্যাচিংয়ের মতো বিষয়টি যখন সমস্যায় রূপ নিয়েছে, তখন তা অদ্ভুত বলা চলে। ক্যাচ নেওয়া আকর্ষণীয় কিছু নয়। এটা পুনরাবৃত্তি, তীক্ষ্ণতা, সচেতনতা ও একাগ্রতার বিষয়। শরীরে যখন ক্লান্তি ভর করে, তখন এসব বিষয় কেন জানি উধাও হয়ে যায়।
এই ক্যাচ ড্রপ ভাইরাসে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত যুজবেন্দ্র চাহাল। এই মৌসুমের শুরুতে তিনি বলেছিলেন, কেউই ম্যাচে নামার সময় চিন্তা করে না যে তারা ক্যাচ ফেলবে। তারপরও এটা ঘটে এবং এটা ক্রিকেটের সাধারণ ব্যাপার।
এই মৌসুমের শুরুতে মুম্বাইয়ের বিপক্ষে পাঞ্জাবের ম্যাচে চাহালের ক্যাচ নেওয়ার প্রচেষ্টার দিকে তাকানো যায়। হয়তো ক্যাচ কেউই ফেলতে চান না, কিন্তু নিশ্চিতভাবে বল হাতের নাগালে আসার আগে চোখ বন্ধ রাখাও যৌক্তিক ব্যাপার নয়।
পাঞ্জাবের অন্যতম সেরা ফিল্ডার শশাঙ্ক সিংয়ের কথা ধরা যাক। শেষ পাঁচটি সুযোগের মধ্যে একটি ছেড়েছেন। যে ক্যাচটি তিনি ছেড়েছেন, বলা যায় সেটা ধরার কোনো চেষ্টাই করেননি তিনি। বাউন্ডারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন, দেখলেন বল উড়ে দড়ির ওপারে পড়ছে, যদিও বল ছিল হাতের নাগালের মধ্যে।
সাবেক আইপিএল খেলোয়াড় শ্রীভাট গোস্বামী বলছিলেন, ‘গেম অ্যাওয়ারনেস’-এর ঘাটতির কারণেই এই দশা। ওয়াশিংটন সুন্দরের ক্যাচ ফেলার কথা বলা যাক। বেঙ্গালুরুর বিপক্ষে বিরাট কোহলির একটি সহজ ক্যাচ শর্ট মিড উইকেটে ছেড়ে দেন তিনি।
ফল ধরেই নেওয়া যায়। কোহলির ৮১ রানের সুবাদে বেঙ্গালু ১৮.৫ ওভারে ২০৬ রান তাড়া করে সফল হয়। কেন ক্যাচ ছাড়ার মহড়া! ‘গেম অ্যাওয়ারনেস’ উত্তর হতে পারে, মাঝেমধ্যে ক্লান্তিও ভোগাচ্ছে খেলোয়াড়দের।
কোভিডের পর থেকে ক্রিকেটাররা ব্যস্ত সূচি পার করছেন। প্রত্যেক বছর অন্তত একটি আইসিসি ইভেন্ট থাকছেই, বিশ্বজুড়ে বহু ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট এবং ব্যস্ত দ্বিপাক্ষিক সূচির কারণে খেলোয়াড়রা ক্লান্তির মধ্যে থেকে বের হতে পারছে না।
২০২৪ সালে আইপিএল ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মাঝে এক সপ্তাহও বিশ্রাম পাননি খেলোয়াড়রা। ২০২৬ সালের গল্পও একক। ৮ মার্চ বিশ্বকাপ শেষ হলো এবং দেড় সপ্তাহ পর খেলোয়াড়দের আইপিএল ক্যাম্পে রিপোর্ট করতে বলা হলো।
অনেক বেশি ক্রিকেট ম্যাচ থাকাই এখন বাস্তব। ভক্তরা একই কথা বলে সবসময়। আইপিএল সূচি খুবই ব্যস্ত। গতকাল দিল্লির হৃদয় ভাঙল। এই হারের পর শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি দূর করার সময় শেষ হতে না হতেই সোমবারের ম্যাচের জন্য প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।
তাছাড়া তীব্র দাবদাহকেও বাইরে রাখা যাচ্ছে না, বিশেষ করে এই বছর। দিল্লিতে সূর্য এতটাই প্রখর ছিল যে বল উঁচুতে উঠলে বোঝাই দায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে, সেটা কোনদিকে আসছে। আর তীব্র তাপের কারণে খেলোয়াড়রা ভয়ানক ক্লান্তি, পানিশূন্যতা ও ক্র্যাম্পের মতো ব্যাপারগুলোর মুখোমুখি হচ্ছে।
ক্যাচ ফেলার জন্য কোনো অজুহাত দেওয়া যদিও সমীচীন নয়। কিছু বহিরাগত বিষয়গুলোর দিকে নজর না দিয়ে শুধু খেলোয়াড়দের দোষারোপ করলে চলবে না। তীব্র তাপ ও ভ্রমণ সূচি ঘাম ছুটাচ্ছে।
ক্যাচ ড্রপ ভাইরাস আসলে রহস্যময় কিছু নয়। এটা এমন এক খেলায় ছড়িয়ে পড়ছে, যেটা বিরামহীনভাবে চলছে, খেলোয়াড়রা লাগাতার ভ্রমণ করছেন, নিজেকে সতেজ করার চেষ্টা শেষ হতে না হতে আরেকটি খেলা এসে পড়ছে।
সহজ ক্যাচ ফেলার ইচ্ছাপোষণ করে সত্যিই কেউ মাঠে নামে না। কেউই হতে চায় না সোশাল মিডিয়ার পরবর্তী ভাইরাল ক্লিপের অংশ। কিন্তু আইপিএলের মতো এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রতিযোগিতায় কখনো কখনো সহজ সুযোগগুলোও ধরে রাখা কঠিনতর হয়ে ওঠে।
