শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে অনেকটা নিস্তেজ হয়ে যাওয়া পুলিশ বাহিনী ধীরে ধীরে কাজকর্মে ফিরলেও, এক বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেছে—তবুও পুরো বাহিনী এখনও শৃঙ্খলার ঘরে ঢুকতে পারেনি। সংস্কার আর পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে এলেও পুলিশের সামনে রয়ে গেছে অন্তত ৬টি বড় চ্যালেঞ্জ।

এই চ্যালেঞ্জগুলো হলো—অভ্যন্তরীণ সংস্কার, অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, ক্ষমতার পালাবদলের সময় থানাগুলো থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার, জুলাই অভ্যুত্থানকালে ছাত্র-জনতার হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার, ঐ মামলার তদন্ত সম্পন্ন করা এবং আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে আয়োজনের প্রস্তুতি।

সাবেক আইজিপি মো. আশরাফুল হুদা বলেছেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সিনিয়র অফিসারদের কঠোর তদারকি দরকার। পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের পুলিশকে দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে হবে এবং তাদের সুযোগ-সুবিধার দিকেও নজর দিতে হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তরিকভাবে কাজ করছে পুলিশ। সদর দপ্তরে গঠিত একাধিক কমিটি প্রতিদিন এ বিষয়ে অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছে, আর আইজিপি সরাসরি এসব তদারকি করছেন।

তবে তদন্তে দেখা গেছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এখনো সফল হয়নি পুলিশ। খুনোখুনি, মব ভায়োলেন্স, ছিনতাই, ডাকাতি—সবকিছুই চলছে আগের মতো। নৃশংস হত্যার ঘটনাও বেড়েছে। অপারেশন ডেভিল হান্ট আর চিরুনি অভিযানের পরও আইনশৃঙ্খলা উন্নতির তেমন কোনো অগ্রগতি নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, মব সহিংসতা, লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করা এখন পুলিশের জন্য বড় পরীক্ষা। তিনি সতর্ক করেছেন, যদি আইনগতভাবে অপরাধীদের দমন না করা যায়, তবে তারা আরও অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।

গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানকালে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে শত শত মানুষ হত্যা করে পুলিশ। এখন পর্যন্ত ১,৭৩০টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ৭৩১টি হত্যা মামলা। এর মধ্যে মাত্র ২৯টির চার্জশিট জমা পড়েছে, বাকিগুলো তদন্তাধীন।

অন্যদিকে ওই অভ্যুত্থান মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করাও বড় চ্যালেঞ্জ। এদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী, এমপি, নেতা থেকে শুরু করে পুলিশের অনেক কর্মকর্তা আছেন। কেউ কেউ বিদেশে পালিয়ে গেছেন। তবে দুজন সাবেক আইজিপিসহ অন্তত ৬৫ পুলিশ কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ক্ষমতার পালাবদলের সময় দেশের ৪৬০ থানা ও ১১৪ ফাঁড়ি থেকে লুট হয় ৫ হাজার ৭৫৩টি অস্ত্র এবং ৬ লাখ ৫১ হাজারের বেশি গুলি। এখনো ১,৩৬৩টি অস্ত্র আর ২ লাখ ৫৭ হাজার গুলি উদ্ধার হয়নি, যা নিরাপত্তার জন্য ভয়াবহ হুমকি।

আগামী জাতীয় নির্বাচন ঘিরেও পুলিশকে নিতে হচ্ছে ব্যাপক প্রস্তুতি। দেড় লাখ পুলিশ সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এজন্য শুরু হচ্ছে বড় পরিসরের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। ভোটকেন্দ্রে বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পুলিশের আশা, নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারলে ২০১৮ সালের রাতের ভোটের দায় থেকে মুক্তি পাবে বাহিনী।

লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে—একটি পিস্তল বা শর্টগান উদ্ধার করলে ৫০ হাজার, চায়না রাইফেল ১ লাখ, এসএমজি ১.৫ লাখ, এলএমজি ৫ লাখ টাকা এবং প্রতিটি গুলি উদ্ধারে ৫০০ টাকা করে পুরস্কার দেওয়া হবে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, পুলিশে নিয়োগ বাণিজ্য বন্ধে সব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি সতর্ক করেছেন, কেউ স্বজন পরিচয়ে বিশেষ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করলে সঙ্গে সঙ্গে তা জানাতে হবে।

news