সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট একসময় বলেছিলেন, ‘যদি দেখেন একটি র‍্যাটলস্নেক আপনাকে কামড়াতে প্রস্তুত, তবে কামড় দেওয়ার আগেই সেটিকে মেরে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ।’
এখন প্রশ্ন উঠছে—মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানকে সেই ‘র‍্যাটলস্নেক’ হিসেবেই দেখছে? যাকে আক্রমণের আগেই ধ্বংস করে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে?

ইরানে নতুন করে বিমান হামলা হঠাৎ বাতিল করার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ঘিরে নানা আলোচনা হলেও একটি বিষয় পরিষ্কার—পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। ঠিক এই কারণেই সেখানে সামরিক শক্তি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ শান্তির বার্তা নয়, বরং সংঘাতের দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

তেহরানের দাবি, ইরানকে ভেতর থেকে অস্থিতিশীল করার ইসরায়েলি চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। সে কারণেই এখন যুদ্ধের পক্ষে নতুন নতুন অজুহাত তৈরি করা হচ্ছে। সম্প্রতি ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওই আলোচনায় তোলা দাবিগুলো ছিল পুরোপুরি একতরফা ও বাস্তবতাবিবর্জিত।

সেসব দাবির মধ্যে ছিল—ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করা, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তর, ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ও মজুত কমানো। বিশ্লেষকদের মতে, এগুলো আলোচনার প্রস্তাব নয়, বরং নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দাবি। ওয়াশিংটন ভালো করেই জানে, তেহরান এসব শর্ত মানবে না। এরপরই বলা হবে, ‘ইরান সৎভাবে আলোচনায় আগ্রহী নয়’—আর সেটাকেই যুদ্ধের বৈধতা হিসেবে ব্যবহার করা হবে।

ইরান বহুবার জানিয়েছে, তাদের সামরিক নীতি মূলত প্রতিরক্ষামূলক। বিপরীতে ইসরায়েলের নীতি বরাবরই আগ্রাসী বলে অভিযোগ রয়েছে। এতদিন সংযম দেখালেও ইরানের সেই অবস্থান যে চিরস্থায়ী নয়, তার ইঙ্গিত মিলেছে সাম্প্রতিক বক্তব্যে।

২০২৫ সালের আগস্টে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী আইআরজিসির সাবেক জেনারেল ও সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ইয়াহিয়া সাফাভি বলেন, “আমাদের আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করতে হবে।”

এর আগেই জানুয়ারিতে ইরানের প্রতিরক্ষা কাউন্সিল এক বিবৃতিতে জানায়, ‘ন্যায্য আত্মরক্ষার কাঠামোর মধ্যেই ইসলামি প্রজাতন্ত্র শুধু হামলার পর প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং হুমকির বাস্তব লক্ষণকেও নিরাপত্তা হিসাবের অংশ হিসেবে বিবেচনা করবে।’ অর্থাৎ ইরান যে চুপচাপ বসে থাকবে না, সেটি স্পষ্ট।

প্রি-এম্পটিভ ওয়ার বা আগাম প্রতিরোধমূলক হামলা বলতে বোঝায়—স্পষ্ট ও আসন্ন হুমকি দেখলে আগে থেকেই আঘাত হানা। এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ। তখন তিরান প্রণালি অবরোধ, আরব দেশগুলোর সেনা সমাবেশ ও টানটান উত্তেজনার মধ্যেই ইসরায়েল প্রথম হামলা চালিয়েছিল।

সৌদি আরব ও মিসরের মাঝামাঝি অবস্থিত গালফ অব আকাবার প্রবেশমুখের একাংশই তিরান প্রণালি নামে পরিচিত। এই পথ দিয়েই জর্ডানের আকাবা বন্দর ও ইসরায়েলের এলিয়াত বন্দরের জাহাজ চলাচল করে—যা ওই যুদ্ধের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

এখন প্রশ্ন একটাই—এই উত্তেজনার শেষ কোথায়, আর প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রটি আসলে কে ছুড়বে?

 

news