মার্কিন বিচার বিভাগ সম্প্রতি প্রকাশ করেছে ‘এপস্টেইন ফাইলস’ নামে পরিচিত বিপুল পরিমাণ নথি। এসব নথি কুখ্যাত ধনকুবের জেফরি এপস্টেইনের বিরুদ্ধে ওঠা যৌন নির্যাতন ও শিশু পাচারের অভিযোগের তদন্তের সঙ্গে যুক্ত। প্রকাশিত ফাইলগুলোতে তাঁর ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ও প্রেমিকা গিলেইন ম্যাক্সওয়েলের ভূমিকাও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তরুণী ও কিশোরী মেয়েদের এপস্টেইনের নির্যাতনের ফাঁদে টেনে আনার কাজটি মূলত তিনিই করতেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজ জানিয়েছে, এই নথিগুলোর মধ্যে রয়েছে ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য, ইমেইল, ব্যক্তিগত ডায়েরির নোট, এফবিআই রিপোর্ট এবং আদালতের বিভিন্ন কপি। সেখানেই উঠে এসেছে—কীভাবে এপস্টেইন ও গিলেইন একসঙ্গে পরিকল্পিতভাবে একটি গ্রুমিং নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন।
ধারণা করা হয়, এই ভয়ংকর চক্রের প্রথম শিকার ধরা পড়ে ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে। মিশিগানের ইন্টারলোচেন স্কুল অব দ্য আর্টস-এর একটি গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্প থেকেই শুরু হয় এই অধ্যায়। ওই সময় ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরী, যাকে আদালতের নথিতে ‘জেন ডো’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে গানের একটি প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন। থিয়েটার, নাচ, সৃজনশীল লেখালেখিসহ নানা শিল্পকলার জন্য এই প্রতিষ্ঠানটি বেশ সম্মানজনক বলে পরিচিত।
নথি অনুযায়ী, ফ্লোরিডার পাম বিচ থেকে প্রায় ২,৫০০ কিলোমিটার দূরের ওই ক্যাম্পে একদিন ক্লাসের ফাঁকে পার্কের একটি বেঞ্চে একা বসে ছিলেন জেন ডো। তখনই তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় এপস্টেইন ও গিলেইনের। এপস্টেইন নিজেকে একজন শিল্প অনুরাগী ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলেন, তিনি প্রতিভাবান তরুণ শিল্পীদের বৃত্তি দিয়ে সহায়তা করেন।
জানা গেছে, জেন ডো-র বাবা এক বছর আগেই মারা যান এবং পরিবারটি তখন আর্থিক সংকটে ছিল। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে এপস্টেইন ও গিলেইন তাঁর পরিবার, আর্থিক অবস্থা ও বাসস্থান সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করেন। যাওয়ার সময় এপস্টেইন জেন ডো-র মায়ের ফোন নম্বর নেন। কয়েক মাস পর ফোন করে মা-মেয়েকে চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানান তিনি।
এভাবেই শুরু হয় দীর্ঘদিনের এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন। ২০২০ সালের একটি ক্ষতিপূরণ মামলার নথিতে এই ঘটনাগুলোর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। পাম বিচে এপস্টেইনের বিশাল বাড়িতে বসে তিনি নিজেকে ‘সহযোগিতাপরায়ণ’ মানুষ হিসেবে তুলে ধরেন। এতে খুশি হয়ে জেন ডো-র মা তাঁকে ‘গডফাদার’ বলে ডাকতে শুরু করেন।
১৪ বছর বয়স হওয়ার পর থেকে জেন ডো নিয়মিত এপস্টেইনের বাড়িতে যেতেন। সেখানে সুইমিংপুলে সময় কাটানো, সিনেমা দেখা, কেনাকাটা—সব মিলিয়ে বিষয়গুলো প্রথমে স্বাভাবিকই মনে হয়েছিল। এপস্টেইন মাঝেমধ্যে তাঁর মায়ের জন্য নগদ অর্থ দিতেন এবং গানের প্রশিক্ষণের খরচও বহন করতেন।
নথিতে বলা হয়েছে, ওই বাড়ির সুইমিংপুল এলাকায় গিলেইনের আচরণ জেন ডো-র কাছে অস্বস্তিকর মনে হতো। তবে গিলেইন বিষয়টিকে ‘বড়দের ব্যাপার’ বলে এড়িয়ে যেতেন এবং বড় বোনের মতো আচরণ করতেন। কিছুদিন পর এপস্টেইন জেন ডো-র ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চান। অভিনেত্রী ও মডেল হওয়ার ইচ্ছার কথা শুনে তিনি ফ্যাশন জগতের পরিচিতির কথা বলে নানা প্রলোভন দেখান।
এরপর থেকেই শুরু হয় নির্যাতনের অধ্যায়, যা বছরের পর বছর ধরে চলেছে বলে নথিতে উল্লেখ আছে। তদন্তে উঠে এসেছে, এপস্টেইনের নেটওয়ার্কে থাকা কিশোরীরাই নতুন মেয়েদের নিয়ে আসত। বিনিময়ে অর্থ দেওয়া হতো। বয়স কম হওয়াটাই সেখানে অগ্রাধিকার পেত—এমন কথাও সাক্ষ্যে উঠে এসেছে।
ভয়ের কারণে বহু বছর মুখ খোলেননি ভুক্তভোগীরা। জেন ডো প্রায় দুই দশক পর প্রথম নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান। অনেকেই এপস্টেইন ও গিলেইনকে একসময় ‘পরিবারের মতো’ ভাবতেন। কিন্তু পরে ভুক্তভোগীদের একজন ইমেইলে গিলেইনকে ‘সাইকোপ্যাথ’ বলে উল্লেখ করেন এবং জানান, মেয়েদের সংগ্রহ ও গ্রুমিংয়ের মূল দায়িত্ব ছিল তাঁরই।
আরও জানা গেছে, ১৯৯৬ সালেই মারিয়া ফার্মার নামে এক নারী এফবিআইয়ের কাছে অভিযোগ করেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, এপস্টেইন তাঁর অপ্রাপ্তবয়স্ক বোনদের ছবি নিয়ে ভয়ভীতি দেখান। তবে সে সময় বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি।
বিচার প্রক্রিয়া চলাকালে ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট কারাগারে থাকা অবস্থায় রহস্যজনকভাবে আত্মহত্যা করেন জেফরি এপস্টেইন। অন্যদিকে, গিলেইন ম্যাক্সওয়েল ২০২১ সালে শিশু যৌন পাচারের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন।
উল্লেখ্য, ‘এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’-এর আওতায় চলতি সপ্তাহে মার্কিন বিচার বিভাগ প্রায় ৩৫ লাখ পৃষ্ঠা নথি, ২ হাজার ভিডিও ও ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি প্রকাশ করেছে। এসব নথিতে বিশ্বের বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে আসায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বজুড়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
