বিশ্বজুড়ে বিমান চলাচলের ইতিহাসে ২০২৬ সাল এক চরম অনিশ্চয়তার বছর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সামরিক সংঘাত কেবল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের আকাশসীমায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে যাচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের পকেটে। বিমানের টিকিটের দাম যে আকাশচুম্বী হবে, তা প্রায় নিশ্চিত।
সিএনএন-এ প্রকাশিত আলেকজান্দ্রা স্কোরেস ও ক্রিস ইসিডোরের এক গভীর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই যুদ্ধের ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে বিমান সংস্থাগুলোর পরিচালন ব্যয় এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছুঁইছুঁই করছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) স্কট কিরবি গত সপ্তাহে সিএনবিসি-কে সতর্ক করে দিয়ে জানিয়েছেন, ভাড়ার ওপর এই প্রভাব খুব দ্রুতই পড়তে শুরু করবে। জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং আমেরিকান এয়ারলাইন্সের সাবেক নির্বাহী রব ব্রিটন পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, একটি বিমান সংস্থার মোট খরচের প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশই ব্যয় হয় জেট ফুয়েলের পেছনে। এই খরচ পুরোটাই নির্ভর করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, জ্বালানির দাম বাড়লে বিমান সংস্থাগুলো দেরি না করে খুব দ্রুত টিকিটের দাম বাড়িয়ে দেয়।
শুধু তাই নয়, এই যুদ্ধের প্রভাবে বিমান চলাচলেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। বিমান চলাচল সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সিরিয়াম’ (Cirium)-এর তথ্যমতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত এই অঞ্চলে প্রায় ৫০ হাজার ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। নিরাপত্তার অভাব ও লোকসানের আশঙ্কায় বিমান সংস্থাগুলো অনেক লাভজনক রুট বন্ধ করে দিচ্ছে। বাজারে ফ্লাইটের সংখ্যা বা সিটের জোগান কমে যাওয়ায় টিকেটের কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। এই সংকটের কারণে বিকল্প অপশন কমে যাওয়ায় যাত্রীদের বাধ্য হয়ে অনেক বেশি দামে টিকেট কাটতে হচ্ছে।
তবে, জ্বালানির দাম বাড়লেই সব সময় যে বিমান সংস্থাগুলো সেই খরচ যাত্রীদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারবে, তা নয়। এভিয়েশন নিউজলেটার ‘ফ্রম দ্য ট্রে টেবিল’-এর লেখক জ্যাক গ্রিফ মনে করেন, টিকিটের দাম নির্ধারণে চাহিদাও একটা বড় বিষয়। যদি মুদ্রাস্ফীতি বা বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ার কারণে মানুষ ভ্রমণের পরিকল্পনা কমিয়ে দেয়, তবে বিমান সংস্থাগুলো বিপাকে পড়বে।
জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম আরেকভাবে যাত্রীদের ক্ষতি করতে পারে। অনেক ফ্লাইট আগে লাভজনক থাকলেও এখন তেলের দামের কারণে সেগুলো লোকসানি হয়ে পড়েছে। ফলে বিমান সংস্থাগুলো এখন অনেক রুটে তাদের ফ্লাইট বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবছে। এছাড়া তেলের অগ্নিমূল্যে স্পিরিট এয়ারলাইন্সের মতো বাজেট ক্যারিয়ারগুলো দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশেষজ্ঞ জ্যাক গ্রিফের মতে, যদি এসব সস্তা এয়ারলাইন্স বাজার থেকে সরে যায়, তবে বাজারে টিকেটের সুস্থ প্রতিযোগিতা নষ্ট হবে। প্রতিযোগিতার অভাবে বড় বিমান সংস্থাগুলো একচেটিয়াভাবে নিজেদের ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ পাবে, যা দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ ভ্রমণকারীদের জন্য বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হবে।
তবে সব বিমান সংস্থা একই অবস্থায় নেই। ডেল্টা এয়ারলাইন্স অন্যদের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে কারণ তাদের নিজস্ব তেল শোধনাগার রয়েছে, যা তাদের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে এবং বাড়তি খরচ থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়। আবার লুফথানসা বা রায়ানএয়ার-এর মতো সংস্থাগুলো আগে থেকে নির্দিষ্ট দামে জ্বালানি কেনার চুক্তি (হেজিং) করে রাখে।
আসন্ন গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে ভ্রমণের চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে, তাই ভাড়া আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, যারা জুন-জুলাই মাসে ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন, তারা যেন এখনই টিকিট কিনে রাখেন। তবে অবশ্যই পরিবর্তনযোগ্য বা ফেরতযোগ্য (Refundable) টিকিট কেনা ভালো, যাতে পরে ভাড়ার দাম কমলে বা পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে আর্থিক লোকসান ছাড়াই টিকেট পরিবর্তনের সুবিধা পাওয়া যায় এবং বাড়তি ভাড়ার ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হয়।
