বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের নীতি ও কর্মকাণ্ড নিয়ে তীব্র সমালোচনা এবং বৈধতা সংকটের মধ্যেই ভারতে নিজেদের প্রতি ব্যাপক জনসমর্থনের দাবি করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। অধিকৃত পশ্চিম তীরে এক সম্মেলনে তিনি বলেন, বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বর্তমানে ভারতেই ইসরায়েলের সবচেয়ে বেশি সমর্থক রয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাড়তে থাকা সমালোচনার প্রেক্ষাপটে এই বক্তব্য রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আড়াল করার একটি প্রচেষ্টা হতে পারে। 

অধিকৃত পশ্চিম তীরে গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসরায়েলের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক ও সংকট থাকলেও ভারতে এমন কোনো পরিস্থিতি নেই। বরং সেখানে ইসরায়েলের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও সমর্থন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

নেতানিয়াহু বলেন, বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বর্তমানে ভারতেই ইসরায়েলের সবচেয়ে বেশি সমর্থক রয়েছে। তিনি ২০১৮ সালে ভারত সফরের স্মৃতিচারণ করে সেটিকে “ভালোবাসার উৎসব” হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দুই দেশের সম্পর্ককে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলেও তুলে ধরেন।

তবে এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইসরায়েলের নীতি নিয়ে সমালোচনা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে দীর্ঘদিনের দখলদারিত্ব, সামরিক অভিযান, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দেশটি ব্যাপক চাপের মুখে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বহুবার এসব বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ইসরায়েলের নীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা যায়নি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের বর্তমান সংকট কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং নৈতিক ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। এমনকি দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যেও দেশটির প্রতি সমর্থন কমছে বলে সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে।

প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ইসরায়েলকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। একই সঙ্গে বৈশ্বিক ইস্যুতে নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতার ওপরও অধিকাংশ মার্কিন নাগরিকের আস্থা কমে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব তথ্য ইঙ্গিত করছে যে ইসরায়েলের সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থান এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রশ্নবিদ্ধ।

এদিকে নিজেদের জনপ্রিয়তা হ্রাসের কারণ হিসেবে নেতানিয়াহু পাকিস্তানকে দায়ী করেছেন। তার অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এই অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ উপস্থাপন করেননি।

বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, আন্তর্জাতিক জনমতের এই পরিবর্তনের মূল কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা নয়; বরং ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের দখলদারিত্ব, সামরিক অভিযান এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ। তাদের মতে, ক্রমবর্ধমান সমালোচনার মুখে ভারতের সমর্থনকে সামনে এনে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে।

পর্যবেক্ষকরা আরও বলছেন, বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি ঐতিহাসিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের প্রতি প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নে নীতিগত অবস্থানের পরিবর্তে কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিলে তা ভারতের বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকেও প্রভাবিত করতে পারে। একইভাবে, ইসরায়েলের সমালোচকরা মনে করেন যে সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বৈধতা অর্জন সম্ভব নয়; বরং টেকসই সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং ন্যায়ভিত্তিক রাজনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজন।

Walton Ads