ইসরায়েল নামের এক অবৈধ রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে আর আরব শাসকদের গোলাম বানাতে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে যুদ্ধের আগুনে পুড়িয়ে দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন ও ইসরায়েল! কিন্তু তারা জানে না, ইরানের ওপর হামলা চালিয়ে নিজেদের কবরের পথ নিজেরাই খুঁড়ল পশ্চিমা শক্তি। ইরানকে দমাতে গিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে। কী এমন গোপন চুক্তি হয়েছে আরব দেশগুলোর সাথে যার জন্য ইরানকে টার্গেট করা হলো? বিস্তারিত জানতে সঙ্গেই থাকুন।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে যে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে তার মূল লক্ষ্য হলো ইরানকে মানসিকভাবে দুর্বল করা এবং অবৈধ ইসরায়েল রাষ্ট্রকে মুসলিম বিশ্বের বুকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক আগ্রাসন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি গভীর চক্রান্তের অংশ। ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি পশ্চিমাদের রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে।

আমেরিকা ও তার পশ্চিমা মিত্ররা ভালো করেই জানে যে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অবৈধ স্বার্থ রক্ষা করার একমাত্র হাতিয়ার হলো ইসরায়েল নামক একটি কৃত্রিম রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখা। কিন্তু এই অঞ্চলে ইরানের শক্তিশালী উপস্থিতি তাদের সেই স্বপ্নপূরণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তারা ইরানকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করতে একের পর এক নোংরা কূটনৈতিক চাল ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ওপর চালানো বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মূলত তাদের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে ধ্বংস করার একটি নগ্ন প্রচেষ্টা মাত্র। ইসরায়েল সবসময়ই ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক গবেষণাকে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে। অথচ স্বয়ং ইসরায়েলের কাছে শত শত অবৈধ পারমাণবিক বোমা রয়েছে যা নিয়ে বিশ্ব মোড়লদের কোনো মাথাব্যথা নেই।

আমেরিকার এই যৌথ হামলার পেছনে আরেকটি বড় উদ্দেশ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান এবং ধনী আরব দেশগুলোর কাছ থেকে ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায় করা। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েতের মতো দেশগুলোকে ইরানভীতি দেখিয়ে ওয়াশিংটন বাধ্য করছে ইসরায়েলের সাথে হাত মেলাতে। এটি মুসলিম উম্মাহর পিঠে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

ইরান কিন্তু এই অন্যায় আগ্রাসনের সামনে কখনো মাথা নত করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না। মার্কিন-ইসরায়েলি বিমান হামলার জবাবে তেহরান যেভাবে শত শত ড্রোন এবং নির্ভুল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে তাতে ইহুদিবাদী রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। ইরানের এই বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ প্রমাণ করে যে তারা যেকোনো মূল্যে নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে সক্ষম।

পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো সবসময়ই ইরানের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে আসছে যাতে বিশ্ববাসীর কাছে ইরানকে একটি আক্রমণাত্মক দেশ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো ইরান কখনোই কোনো দেশ আগে আক্রমণ করেনি বরং তারা সবসময় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে মজলুম মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্য ইরানের অবদান চিরস্মরণীয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা এবং এই লক্ষ্য অর্জনে তারা যেকোনো ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে প্রস্তুত। ইরাক, লিবিয়া এবং সিরিয়াকে ধ্বংস করার পর এখন তাদের মূল লক্ষ্য হলো ইরানকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা। কিন্তু ইরানের সচেতন জনগণ এবং শক্তিশালী নেতৃত্ব পশ্চিমাদের সেই কালো হাত ভেঙে দিতে প্রস্তুত।

আরব বিশ্বের কিছু কাপুরুষ শাসক নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য আমেরিকার গোলামি করছে এবং ইসরায়েলের সাথে গোপনে হাত মেলাচ্ছে। তারা ভাবছে আমেরিকা তাদের রক্ষা করবে কিন্তু ইতিহাস বলে যে প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে ওয়াশিংটন তাদেরও ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলবে। ইরানের মতো একটি শক্তিশালী মুসলিম প্রতিবেশীর সাথে শত্রুতা করে তারা নিজেদের বিপদ ডেকে আনছে।

ইরানের ওপর হামলা চালিয়ে আমেরিকা ও ইসরায়েল আসলে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এক মহাবিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। তেহরান কর্তৃক কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। এর ফলে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের বাজারে মূল্যস্ফীতি চরম আকার ধারণ করেছে।

ইসরায়েল নামক রাষ্ট্রটি যে কতটা ভঙ্গুর তা ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমেই পরিষ্কার হয়ে গেছে। তাদের বহুল প্রচারিত 'আয়রন ডোম' বা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের অত্যাধুনিক হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের গতি রুখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এই যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে মার্কিন সাহায্য ছাড়া ইসরায়েল একদিনও টিকে থাকার ক্ষমতা রাখে না।

সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মূল চালিকাশক্তি হলো অস্ত্র ব্যবসা এবং যুদ্ধ জিইয়ে রাখা যাতে তাদের সামরিক শিল্প লাভবান হতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর এখন তারা মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করতে চায় যাতে আরব দেশগুলোর কাছে ট্রিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করা যায়। ইরান এই নোংরা অস্ত্র ব্যবসার রাজনীতির বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।

ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ইরান যেভাবে স্বনির্ভরতা অর্জন করেছে তা বিশ্বের যেকোনো স্বাধীন দেশের জন্য একটি বড় অনুপ্রেরণা। দীর্ঘ চার দশক ধরে কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান নিজেদের প্রযুক্তিতে উন্নত ড্রোন, রাডার এবং ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে। পশ্চিমাদের প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে তারা আজ নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়েছে।

আমেরিকা ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের সরকার পরিবর্তনের বা 'রেজিম চেঞ্জ'-এর যে অপচেষ্টা চালাচ্ছে তা কোনোদিনই সফল হবে না। তারা ইরানের অভ্যন্তরীণ কিছু অসন্তোষকে পুঁজি করে দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা করেছিল কিন্তু দেশের সচেতন নাগরিকরা বিদেশী চক্রান্ত বুঝতে পেরে সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে। ইরানের জনগণ তাদের দেশের স্বাধীনতাকে অত্যন্ত ভালোবাসে।

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ করা এবং ফিলিস্তিনিদের তাদের নিজস্ব ভূমি ফিরিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। ইরান সবসময়ই এই যৌক্তিক দাবির পক্ষে সোচ্চার থেকেছে এবং এর জন্য চরম মূল্য চোকাতে হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ব মুখে মানবাধিকারের কথা বললেও ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদকে তারা প্রতিনিয়ত অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে মদদ দিচ্ছে।

লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের মতো প্রতিরোধ যোদ্ধারা ইরানের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অন্যতম প্রধান শক্তি। তারা ঐক্যবদ্ধভাবে মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থে আঘাত হানছে যা পশ্চিমাদের জন্য এক বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়। এই অক্ষ শক্তিকে ধ্বংস করার ক্ষমতা আমেরিকা বা ইসরায়েল কারোরই নেই।

ইতিহাস সাক্ষী আছে যে যারা অন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছে তাদের পতন অবশ্যম্ভাবী। আমেরিকার অর্থনীতি আজ ঋণের বোঝায় জর্জরিত এবং তাদের সামরিক শক্তিও ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে যেভাবে তারা লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে ইরানের মাটি থেকেও তাদের ঠিক সেভাবেই বিদায় নিতে হবে। বিজয় শেষ পর্যন্ত সত্য ও ন্যায়েরই হবে।

ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যে স্বপ্ন ওয়াশিংটন দেখছে তা আসলে একটি অলীক কল্পনা মাত্র। আরবের সাধারণ জনগণ কিন্তু তাদের শাসকদের মতো মেরুদণ্ডহীন নয় তারা মন থেকে ইরানকে এবং ফিলিস্তিনকে সমর্থন করে। শাসকদের বাধ্যবাধকতার বাইরে গিয়ে আরবের সাধারণ মানুষ আজ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসছে।

ইরান অত্যন্ত ধৈর্য এবং দূরদর্শিতার সাথে এই সংকটের মোকাবেলা করছে এবং তারা আন্তর্জাতিক আইন মেনেই নিজেদের আত্মরক্ষা করছে। পাকিস্তান এবং ওমানের মতো বন্ধুভাবাপন্ন দেশগুলোর মাধ্যমে তারা কূটনীতির দরজাও খোলা রেখেছে। তবে কেউ যদি তাদের দুর্বল ভেবে আঘাত করতে আসে তবে তার পরিণতি যে ভয়াবহ হবে তা তারা বুঝিয়ে দিয়েছে।

যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্সের মতো ইউরোপীয় দেশগুলো অন্ধের মতো আমেরিকার এই যুদ্ধংদেহী নীতিকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে যা অত্যন্ত লজ্জাজনক। তারা নিজেদের জলসীমায় বা ঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীকে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে। এর মাধ্যমে ইউরোপও নিজেদের মধ্যপ্রাচ্যের এই বিশাল যুদ্ধের আগুনে জড়িয়ে ফেলছে যার ফল ভালো হবে না।

পশ্চিমারা ইরানের ওপর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালানোরও চেষ্টা করছে যাতে তরুণ প্রজন্মকে তাদের ঐতিহ্য ও ধর্ম থেকে দূরে সরানো যায়। কিন্তু ইরানের সমাজব্যবস্থা অত্যন্ত সুসংহত এবং তারা তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কোনো ধরনের প্রোপাগান্ডা দিয়ে ইরানের এই আত্মিক শক্তিকে ধ্বংস করা সম্ভব নয়।

আমেরিকা ও ইসরায়েলের এই যৌথ সামরিক হামলায় ইরানের সাধারণ বেসামরিক নাগরিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যা স্পষ্টতই যুদ্ধাপরাধ। একটি মেয়েদের স্কুলে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনে শত শত নিরপরাধ শিক্ষার্থীকে হত্যা করার ঘটনা পশ্চিমাদের আসল বর্বর চেহারা উন্মোচন করে দেয়। তারা মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও কাজে খুনি।

ইরানের নৌবাহিনী পারস্য উপসাগরে যে আধিপত্য বিস্তার করেছে তা মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের অহংকারকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো এখন ইরানের জলসীমার কাছাকাছি আসতে ভয় পায় কারণ তারা জানে ইরানের একটি সুইসাইড ড্রোনই তাদের ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট। পারস্য উপসাগরের প্রকৃত মালিক এই অঞ্চলের স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোই।

বিশ্বের বড় শক্তিগুলো যেমন রাশিয়া এবং চীনও আমেরিকার এই একতরফা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এবং তারা ইরানের সাথে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও জোরদার করছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পশ্চিমাদের অন্যায় প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান প্রমাণ করে যে আমেরিকা এখন আর একক বিশ্ব মোড়ল নয়। বহুমুখী বিশ্বের উত্থান ঘটছে।

ইরান আজ মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের প্রতীক এবং তারা প্রমাণ করেছে যে সঠিক নেতৃত্ব থাকলে যেকোনো পরাশক্তিকে মোকাবেলা করা সম্ভব। ইসরায়েলকে টিকিয়ে রাখার জন্য আমেরিকার এই মরিয়া চেষ্টা আসলে তাদের ডুবন্ত সাম্রাজ্যকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা মাত্র। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে তারা আবার একই ভুল করছে।

শেষে বলা যায় যে ইরানের ওপর চালানো এই যৌথ হামলা আসলে ইসরায়েলকে আরব বিশ্বের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার একটি ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র। কিন্তু ইরানের অদম্য ইচ্ছা এবং প্রতিরোধ এই চক্রান্তকে ধুলোয় মিশিয়ে দেবে। ইরান দীর্ঘজীবী হোক এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পরাজয় নিশ্চিত হোক।

Walton Ads