ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনার কারণে বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রপ্তানির প্রধান সাগর পথ হরমুজ প্রণালী আবারও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আরটি (RT) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পুনরায় ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে সামরিক হামলার পর এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যা কয়েক সপ্তাহের স্বল্প স্থায়ী শান্তির অবসান ঘটিয়েছে। ইরান এই হামলার জবাবে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে প্রণালী বন্ধ ঘোষণা করেছে। গত মাসে এক ক্ষণস্থায়ী সমঝোতার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ তুলে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যেখানে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার কথা বলেছিল। কিন্তু দুই পক্ষই একে অপরের সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। এই জলপথ মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস রপ্তানির এক পঞ্চমাংশ পরিবহন করে, যা সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরায়েলি নিষ্ঠুর যুদ্ধের প্রধান চাপের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা হ্রাস করার লক্ষ্যে তারা একাধিক হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে ছিল বিমান প্রতিরক্ষা, রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটি, ছোট নৌকা এবং অন্যান্য সামরিক লক্ষ্য। অন্যদিকে ইরান বলছে, তারা মার্কিন সামরিক আক্রমণের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্য এই প্রতিহত হামলা চালিয়েছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি সতর্ক করেছে যেন তারা মার্কিন বাহিনীকে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেয়। ইরান বলছে, প্রণালীতে চলাচল নিয়ন্ত্রণের অধিকার তাদের আছে এবং অনুমতি ছাড়া বা নিরাপত্তা নির্দেশনা উপেক্ষা করে যেসব জাহাজ চলাচল করবে, তাদেরকে শত্রুপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

ইরানের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেছেন, ‘‘আমরা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমাদের দেশের স্বার্থ রক্ষা করব এবং এক ইঞ্চিও ছাড়ব না।’’ এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন প্রণালীর নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছে এবং ২০ শতাংশ নিরাপত্তা ফি ধার্য করার পরিকল্পনা করছে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। জাহাজ চলাচলে এই সংকটের কারণে তেলের দামও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড প্রায় ১০ শতাংশ ও ইউএস ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট ৯ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত চার সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ।

নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বীমা খরচও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাণিজ্যিক চলাচলের ব্যয় বৃদ্ধি করবে। আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও এসেছে। চীন নিরাপদ ও মুক্ত চলাচলের আহ্বান জানিয়েছে এবং ভারত ইরানের উপ-রাজদূতকে ডেকে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ফি ধার্য করার প্রস্তাবকে কঠোর সমালোচনা করেছেন।

এই খবরটি কেন গুরুত্বপূর্ণ

এই সংকটটি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাকে নয়, বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাকেও প্রভাবিত করছে। হরমুজ প্রণালী বিশ্ব তেল সংস্থানের প্রায় ২০ শতাংশ বহন করে, তাই এর অবরোধের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া হতে পারে। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য উদ্বেগের কারণ। ভবিষ্যতে এই জলপথের নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক চলাচলের স্থিতিশীলতা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

Walton Ads