আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে ইউরোপের সামরিক ভবিষ্যত নিয়ে স্পষ্ট বিভাজন এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে গঠনমূলক দ্বন্দ্ব প্রকাশ পেয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আরটি (RT) জানিয়েছে, সামরিক বাজেট, যুদ্ধ নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে গভীর মতপার্থক্য ন্যাটো জোটের ভবিষ্যতের কাঠামো নির্ধারণে প্রভাব ফেলছে।
ন্যাটো কখনোই এমন একটি জোট ছিল না যেখানে সব সদস্য দেশ একই রাজনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তে একমত হতো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরোধের প্রেক্ষাপটে, এই বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফ্রান্স, ব্রিটেন, ইতালি এবং স্পেনের মতো বড় দেশগুলো সরাসরি ঐ সংঘর্ষে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছে। এই অনীহা শুধু উত্তেজনা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগের কারণে নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের প্রতি রাজনৈতিক অসন্তোষেরও ফল।
ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে চিনের প্রতি নীতি নেয়ার ধরণেও অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে। এছাড়া, ইন্দো-প্যাসিফিক, আফ্রিকা এবং আর্টিক অঞ্চলের মতো ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোকে আঙ্কারায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি, যা জোটের দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরে।
সামরিক খরচ নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ন্যাটো সদস্যদের জিডিপির ৫ শতাংশ সামরিক ব্যয়ে বাধ্য করার চেষ্টা করছে। যদিও কিছু দেশ এই লক্ষ্যের প্রতি সমর্থন জানায়, স্পেন স্পষ্টভাবে এর বিরোধিতা করছে। মাদ্রিদ বলছে, সামরিক সক্ষমতা শুধুমাত্র ব্যয়ের শতাংশে নির্ধারিত হয় না। ২০১৮ সালের ০.৯ শতাংশ থেকে বর্তমানে প্রায় ২ শতাংশে স্পেনের সামরিক বাজেট বৃদ্ধি পেয়েছে এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে। তবে এই বিরোধের পেছনে রাজনৈতিক কারণও কাজ করছে, বিশেষ করে ইরান সংকট এবং ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের বিরুদ্ধে স্পেনের অসন্তোষ।
ন্যাটো-র ভবিষ্যত শেয়ারিং এবং দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে আলোচনা এখন জাতীয় রাজনৈতিক কৌশল দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, যেখানে সম্মিলিত কৌশলগত দৃষ্টি অনেকাংশেই বিলীন। ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে বলেন, জোট একটি “ট্রান্সআটলান্টিক প্রতিরক্ষা শিল্প বিপ্লবের” সন্নিকটে আছে, তবে বাস্তবে বড় ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ইউরোপের সামরিক কাঠামো এবং উৎপাদন ক্ষমতা এখনও অনেক দুর্বল।
ইউক্রেনের পরিস্থিতিও ন্যাটোর ঐক্যকে একত্রিত রাখতে পারছে না। আঙ্কারার ঘোষণায় ইউক্রেনের ভবিষ্যত ন্যাটো সদস্যপদে সমর্থন না দেওয়া এবং কিছু দেশের সামরিক সহায়তা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত এই বিভাজনকে ফুটিয়ে তোলে। ইউক্রেনের প্রতি দীর্ঘমেয়াদী সমর্থন এখন ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে, যা ন্যাটোর সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
আঙ্কারায় ন্যাটোর দীর্ঘমেয়াদী রূপান্তর নিয়ে আলোচনা হয়, যেখানে 'ন্যাটো ৩.০' মডেল প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, যা ইউরোপীয় সদস্যদের নিয়মিত সামরিক দায়িত্ব গ্রহণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করবে। যুক্তরাষ্ট্রের ফোকাস ধীরে ধীরে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সরে যাওয়ায় ইউরোপের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
এই খবরটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
ন্যাটো এবং ইউরোপের সামরিক ভবিষ্যত কেবল একটি সামরিক জোটের কাঠামো পরিবর্তন নয়, বরং এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে। ইউরোপীয় দেশগুলো যখন নিজেদের কৌশলগত স্বনির্ভরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও পরিবর্তিত হচ্ছে, যা নতুন জোট কাঠামো এবং সংকট মোকাবেলায় কার্যকরতা নির্ধারণ করবে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন এবং চীনসহ বিভিন্ন বড় ইস্যুতে বিভাজনের কারণে ন্যাটোর ঐক্য ও স্থিতিশীলতা পরীক্ষা হতে পারে। সামরিক বাজেট ও নীতিতে মতবৈষম্য দূর করতে পারলেই ইউরোপ ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র প্রতিরক্ষা নীতি গ্রহণ করতে পারবে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।