একটা বনের কথা বলছি, যেখানে গাছের সংখ্যা মানুষের চেয়েও বেশি। প্রায় তিনশো নব্বই বিলিয়ন গাছ দাঁড়িয়ে আছে এই বনে। এই একটা বনই পৃথিবীর মিঠা পানির প্রায় পনেরো থেকে বিশ শতাংশ সমুদ্রে ফেলে। অথচ এই বনের নিচেই লুকিয়ে আছে দুই হাজার পাঁচশো বছরের পুরনো এক হারানো শহর। আজকে বলব আমাজন বনের গল্প, যাকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস।
তো চলুন, প্রথমে বুঝে নিই আমাজন বন আসলে কতটা বিশাল। এই বন ছড়িয়ে আছে দক্ষিণ আমেরিকার নয়টি দেশ জুড়ে। এর মধ্যে আছে ব্রাজিল, পেরু, বলিভিয়া এবং কলম্বিয়া। আরও আছে ইকুয়েডর, ভেনেজুয়েলা, গায়ানা, সুরিনাম এবং ফ্রান্সের অধীনস্থ ফরাসি গায়ানা।
মোট আয়তন প্রায় ষষট্টি থেকে সাতষট্টি লাখ বর্গ কিলোমিটার। এটা ইউরোপ মহাদেশের চেয়েও বড়, প্রায় ভারতের দ্বিগুণ। এই বিশাল এলাকার প্রায় ষাট শতাংশই পড়েছে একা ব্রাজিলের ভেতরে। তাই আমাজনের গল্প বলতে গেলে ব্রাজিলের কথা সবচেয়ে বেশি আসবে।
এই বনে বাস করে প্রায় তিন থেকে সাড়ে চার কোটি মানুষ। এদের মধ্যে প্রায় নব্বই শতাংশ মানুষ শহর ও নগরে থাকেন, যেমন ব্রাজিলের মানাউস শহর। বাকিরা বনের গভীরে, নদীর ধারে ছোট ছোট জনপদে বাস করেন।
আমাজনে বাস করে তিনশোর বেশি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী। তারা প্রায় তিনশো ভিন্ন ভাষায় কথা বলেন। এদের মধ্যে প্রায় ষাটটি গোষ্ঠী আজও বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখে না। ভাষা মূলত পর্তুগিজ, স্প্যানিশ এবং শত শত আদিবাসী ভাষার মিশ্রণ।
সংস্কৃতির দিক থেকে আমাজন এক অনন্য মিশ্রণ। এখানে মিশে আছে আদিবাসী ঐতিহ্য, পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক প্রভাব এবং আফ্রিকান বংশোদ্ভূত কিলোম্বোলা সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি। এই মিশ্রণই আমাজনকে করে তুলেছে আরও রহস্যময়।
এখন প্রশ্ন হলো, একটা বনের আবার শাসনব্যবস্থা কী করে হয়? আসলে আমাজন কোনো একক দেশ নয়, এটা নয়টি দেশের ভাগাভাগি করা এক ভূখণ্ড। তাই এর ইতিহাস মানে নয়টি আলাদা ইতিহাসের সংমিশ্রণ।
প্রায় বারো হাজার বছর আগে থেকে মানুষ বাস করত এই বনে। আনুমানিক পনেরোশো সালে ইউরোপীয়রা এখানে পা রাখে। এরপর প্রায় চারশো বছর ধরে চলে পর্তুগিজ ও স্প্যানিশ ঔপনিবেশিক শাসন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে একে একে স্বাধীন হয় ব্রাজিল, পেরু, বলিভিয়াসহ অন্য দেশগুলো।
উনিশশো নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত আমাজন বনকে দেখা হতো শুধু সম্পদের ভাণ্ডার হিসেবে। রাবার, কাঠ আর সোনার লোভে চলত ব্যাপক উজাড়। কিন্তু পরিবেশ সচেতনতা বাড়ার পর দেশগুলো বুঝতে শুরু করে, এই বন রক্ষা করাটাও জরুরি।
উনিশশো পঁচানব্বই সালে গঠিত হয় আমাজন কোঅপারেশন ট্রিটি অর্গানাইজেশন, যাকে সংক্ষেপে বলা হয় আক্টো। এই সংগঠনে আছে আমাজন-ভাগাভাগি করা সবগুলো দেশ। এর কাজ হলো বন সংরক্ষণ ও উন্নয়ন নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা। তবে প্রতিটি দেশ তাদের নিজেদের ভূখণ্ডে নিজস্ব আইন অনুযায়ীই বন পরিচালনা করে।
ব্রাজিলে আমাজনের একটা বড় অংশকে বলা হয় লিগ্যাল আমাজন। এই এলাকা পরিচালিত হয় ব্রাজিলের পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও ইনপে নামের মহাকাশ গবেষণা সংস্থার নজরদারিতে। এই সংস্থা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে প্রতিদিন বন উজাড়ের হিসাব রাখে।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আদিবাসী ভূখণ্ড। আমাজনের প্রায় সাতাশ থেকে ত্রিশ শতাংশ এলাকা আনুষ্ঠানিকভাবে আদিবাসীদের নামে সংরক্ষিত। গবেষণা বলছে, আদিবাসীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বন উজাড়ের হার তুলনামূলক অনেক কম। ফলে আদিবাসী অধিকার আর পরিবেশ রক্ষা এখন একসঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
এবার আসি টাকা-পয়সার হিসাবে। আমাজন বন শুধু গাছপালার জায়গা নয়, এটা একটা বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রও বটে। এখানকার অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটা প্রধান খাতের ওপর।
প্রথম খাত হলো কৃষি, বিশেষ করে গরু পালন ও সয়াবিন চাষ। বিশেষজ্ঞদের হিসাবে, বন উজাড়ের প্রায় আশি শতাংশের পেছনে দায়ী এই কৃষি সম্প্রসারণ। প্রতি কেজি গরুর মাংস উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় একশো বর্গমিটার বনভূমি।
দ্বিতীয় খাত হলো খনিজ সম্পদ। আমাজনের মাটির নিচে আছে সোনা, তামা ও লোহা আকরিকের বিশাল ভাণ্ডার। বৈধ খনির পাশাপাশি চলে বিপুল অবৈধ সোনা উত্তোলন, যা পরিবেশ ও নদীর পানি দুটোই দূষিত করে।
তৃতীয় খাত হলো কাঠ শিল্প এবং জ্বালানি সম্পদ। আমাজনের নিচে আছে তেল ও গ্যাসের মজুতও, বিশেষ করে ইকুয়েডর ও পেরুর অংশে। এই সম্পদ আহরণ নিয়ে প্রায়ই দ্বন্দ্ব বাধে আদিবাসী সম্প্রদায় আর সরকারের মধ্যে।
চতুর্থ খাত হলো ইকো-ট্যুরিজম এবং তথাকথিত বায়ো-ইকোনমি। ব্রাজিল, পেরু ও ইকুয়েডরে পর্যটন এখন দ্রুত বাড়ছে বন সংরক্ষণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। আসাই বেরি, ব্রাজিল নাট আর ঔষধি উদ্ভিদের রপ্তানি থেকেও আসছে বাড়তি আয়।
ব্রাজিলের আমাজন অঞ্চল একাই দেশটার মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় আটচল্লিশ শতাংশের জন্য দায়ী, মূলত বন উজাড়ের কারণে। এই পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে অর্থনীতি আর পরিবেশ কতটা জড়িয়ে আছে এখানে।
তবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও কম নয়। দুই হাজার আট সাল থেকে চালু আছে আমাজন ফান্ড, যেখানে জমা পড়েছে প্রায় নয় থেকে দশ বিলিয়ন ডলার। এই তহবিল আসে মূলত নরওয়ে, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশ থেকে, আর ব্যয় হয় বন সংরক্ষণ প্রকল্পে।
যেহেতু আমাজন কোনো একক রাষ্ট্র নয়, তাই এর কোনো নিজস্ব সেনাবাহিনী নেই। কিন্তু এই বন ঘিরে আছে জটিল নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বাস্তবতা। এটাই আমাজনকে করে তুলেছে বিশ্ব রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু।
সীমান্ত এলাকায়, বিশেষ করে ব্রাজিল, কলম্বিয়া ও পেরুর সংযোগস্থলে, সক্রিয় আছে অবৈধ মাদক পাচার নেটওয়ার্ক। এসব এলাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করে অবৈধ সোনার খনি ও কাঠ পাচারের রুট। ফলে স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য এই বন এক কঠিন চ্যালেঞ্জ।
ব্রাজিল সরকার নিয়মিত সামরিক ও পুলিশ অভিযান চালায় অবৈধ খনি ও কাঠ কাটা বন্ধ করতে। একে বলা হয় অপারেশন গ্রিন ব্রাজিল। তবে সমালোচকরা বলেন, বিশাল এলাকার তুলনায় নজরদারির সক্ষমতা এখনও অপ্রতুল।
কূটনৈতিক দিক থেকে আমাজন এখন জলবায়ু আলোচনার কেন্দ্রে। দুই হাজার পঁচিশ সালের নভেম্বরে ব্রাজিলের বেলেম শহরে অনুষ্ঠিত হয় কপ-থার্টি জলবায়ু সম্মেলন, একেবারে আমাজনের কোলঘেঁষে। এই আয়োজন গোটা বিশ্বের নজর টেনে আনে এই বনের দিকে।
আমাজন নিয়ে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর অবস্থানও ভিন্ন ভিন্ন। উন্নত দেশগুলো প্রায়ই সংরক্ষণের জন্য তহবিল ও চাপ দুটোই দেয়। আবার আমাজন-ভাগাভাগি দেশগুলো বলে, বনের ওপর তাদের সার্বভৌম অধিকার সম্মান করা উচিত। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ভারসাম্য রাখাটাই এখন সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
আঞ্চলিক প্রভাবের দিক থেকে ব্রাজিল স্বাভাবিকভাবেই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে, কারণ বনের বেশিরভাগ অংশ তাদের ভূখণ্ডে। তবে আক্টোর মাধ্যমে অন্য দেশগুলোও নিজেদের অবস্থান জানানোর সুযোগ পায়। এই ভারসাম্যই ঠিক করে আমাজন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে নেওয়া হবে।
তো আমাজনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী? বিজ্ঞানীরা একে বলছেন "টিপিং পয়েন্ট" বা ভাঙন-বিন্দুর ঝুঁকি। এর মানে বোঝাতে একটা সহজ উপমা দিই।
ধরুন একটা বাড়ির ছাদ ধরে রাখছে কয়েকটা খুঁটি। কিছু খুঁটি সরালে বাড়ি টিকে থাকে। কিন্তু একটা সীমা পার হলে পুরো ছাদ হুট করে ভেঙে পড়ে। বিজ্ঞানীদের ভয়, আমাজনের বনও একদিন এভাবেই আর্দ্র বন থেকে শুকনো সাভানায় বদলে যেতে পারে।
দুই হাজার তেইশ সালে এক বছরেই উজাড় হয় প্রায় তেরো হাজার বর্গকিলোমিটার বন। তবে সাম্প্রতিক তথ্য কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে। দুই হাজার ছাব্বিশ সালের শুরুতে ব্রাজিলের আমাজনে বন উজাড় কমেছে প্রায় সাঁইত্রিশ শতাংশ, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
এর পেছনে আছে কড়া নজরদারি, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং আদিবাসী আন্দোলনের ধারাবাহিক চাপ। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, স্বল্প সময়ের এই উন্নতি স্থায়ী কি না, তা বলার সময় এখনও আসেনি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরা আর দাবানলের ঝুঁকি এখনও রয়ে গেছে।
ভবিষ্যতের সম্ভাবনার কথা বললে, অনেকেই আশা দেখছেন তথাকথিত বায়ো-ইকোনমি মডেলে। অর্থাৎ বন কেটে নয়, বন রেখেই তার সম্পদ থেকে আয় করা। এর মধ্যে আছে টেকসই কৃষি, ইকো-ট্যুরিজম এবং আদিবাসী নেতৃত্বাধীন সংরক্ষণ প্রকল্প।
তবে ভিন্নমতও আছে। কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, দ্রুত উন্নয়নের জন্য কৃষি ও খনি খাতকে পুরোপুরি থামানো বাস্তবসম্মত নয়। তাদের যুক্তি, সংরক্ষণ আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে একটা ভারসাম্য দরকার। এই বিতর্ক আমাজনের নীতিনির্ধারণে এখনও চলমান।
তো এই ছিল আমাজন বনের গল্প। নয়টি দেশ, তিনশোর বেশি ভাষা, আর পৃথিবীর অক্সিজেন-ভাণ্ডারের একটা বিশাল অংশ, সব মিলিয়ে এক অবিশ্বাস্য বাস্তুতন্ত্র। এই বনের ভবিষ্যৎ শুধু দক্ষিণ আমেরিকার নয়, পুরো পৃথিবীর ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
আপনার কী মনে হয়, সংরক্ষণ আর উন্নয়নের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে সম্ভব? কমেন্টে জানান আপনার মতামত।