আজকাল বিশ্বজুড়ে ক্ষমতার করিডোরে একটি নতুন শব্দ বেশ শোনা যাচ্ছে। অনেকে একে বলছেন ‘রেড-গ্রিন অ্যালায়েন্স’ বা লাল-সবুজ জোট। আমেরিকার ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতর যে পরিবর্তন ঘটছে, তা নিয়ে চিন্তিত বিশ্লেষকরা। সাধারণ মানুষ হয়তো একে কেবল রাজনৈতিক আদর্শ ভাবছেন। কিন্তু বাস্তবে এটি কি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য কোনো বড় হুমকি?
সম্প্রতি আমেরিকার মিশিগানে আবদেল এল-সায়েদ নামে একজন প্রগতিশীল চিকিৎসক জয়ী হয়েছেন। তিনি নভেম্বরের নির্বাচনে সেনেটর হওয়ার দৌড়ে এখন বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন। তিনি যদি সফল হন, তবে ইতিহাস গড়বেন আমেরিকার প্রথম মুসলিম সেনেটর হিসেবে। তার এই জয় আমেরিকার মূলধারার রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ডেমোক্রেটিক পার্টিতে এর আগেও এমন অনেক মুসলিম নেতা উঠে এসেছেন। ইলহান ওমর বা রাশিদা তালিবের মতো প্রতিনিধিরা এখন বেশ পরিচিত মুখ। তারা অনেকটা প্রগতিশীল ভোটার এবং মুসলিম অ্যাডভোকেসি গ্রুপের মধ্যে সেতুর কাজ করছেন। স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে বড় শহরগুলোতে এখন তাদের জোরালো অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
আমাজন বন: পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় বন
মিনিয়াপোলিস, ডিয়ারবর্ন কিংবা নিউ জার্সি শহরের দিকে তাকালে আপনি সেটা পরিষ্কার বুঝতে পারবেন। সেখানে এখন অনেক মুসলিম মেয়র ও কাউন্সিলর দায়িত্ব পালন করছেন। এদের অনেকেই প্রগতিশীল এবং মুসলিম ভোটার ব্লকের সম্মিলিত সমর্থনে জয়ী হয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে, এই জোট এখন কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নেই।
নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানী সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়েছেন। তার জয় প্রগতিশীল রাজনীতি এবং ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের এক চূড়ান্ত রূপ। বিশেষজ্ঞরাই বলছেন, এই ধরনের কঠোর অবস্থান এখন আর প্রান্তিক কোনো বিষয় নয়। আমেরিকার সবচেয়ে বড় শহরের মূলধারার রাজনীতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই নতুন রাজনৈতিক কৌশল।
তিনি ফেডারেল সরকারকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন। এর ফলে ডেমোক্র্যাটরা এখন মধ্যপ্রাচ্য এবং ইসরায়েল নিয়ে তাদের পুরনো অবস্থান নতুন করে ভাবছেন। অর্থাৎ, বামপন্থীদের সঙ্গে ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর কৌশলগত চিন্তাধারার মিল এখন অনেকটা দৃশ্যমান। যা পশ্চিমা রাজনীতির কাঠামোকেই নাড়া দিচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে মার্কিন সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞ সদস্য এবং মানবাধিকার কর্মী মনসুর হোসেন লগারির কথা না বললেই নয়। তিনি পাকিস্তান থেকে অভিবাসী হয়ে আমেরিকায় এসেছেন। তিনি ‘রেড-গ্রিন অ্যালায়েন্স’-এর বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তার মতে, এটি বামপন্থী বিপ্লব এবং রাজনৈতিক ইসলামবাদের এক ভয়ঙ্কর ও অবহেলিত মেলবন্ধন।
লগারির মতে, এই রাজনৈতিক ইসলামবাদ সাধারণ মুসলিম বা ধর্মের সাথে সম্পর্কযুক্ত নয়। এটি মূলত গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদ এবং দেওয়ানি আইনের ওপর ধর্মীয় কর্তৃত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। তিনি মনে করেন, এটি পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। নাগরিক সমাজকে এই বিপদ সম্পর্কে সজাগ থাকা এখন খুবই জরুরি।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, যারা সেক্যুলারিজম বা সমকামী অধিকারের দাবি তোলে, তারা কেন ইসলামপন্থীদের সমর্থন দিচ্ছে? লগারির ভাষায়, তাদের আদর্শ এক না হলেও, তাদের শত্রু অভিন্ন। আমেরিকান শক্তি, পশ্চিমা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং পুঁজিবাদ ধ্বংস করা—এই সবক্ষেত্রেই তারা একই সুরে কথা বলছে।
তারা আমেরিকাকে একটি সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্রের বদলে কেবলই এক ‘সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্প’ হিসেবে প্রচার করছে। সমাজকে তারা শোষক এবং শোষিত—এই দুই ভাগে ভাগ করে ফেলে। তাদের টার্গেট কেবল ইসরায়েল নয়, বরং আমেরিকার সামাজিক সংহতি। এই ধারণা এখন ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে মূলধারার রাজনীতিতে ঢুকে পড়ছে।
ডেমোক্রেটিক পার্টি একটি বিশাল দল, যেখানে অনেকেই এসব চরমপন্থীকে প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু ক্রমবর্ধমান এক প্রগতিশীল অংশ এই ধারণাগুলোকে দলের ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখছে। লগারির সতর্কতা হলো, এই চিন্তাভাবনা শুধু সেমিনারে আটকে নেই। এটি সরকারি দপ্তরেও প্রভাব ফেলছে।
একজন প্রাক্তন সেনাসদস্য হিসেবে লগারির মতে, প্রস্তুতি মানে শুধু অস্ত্র বা সেনা নয়। এটি মূলত জনগণের আস্থা এবং দেশপ্রেমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। নতুন প্রজন্মের তরুণদের যদি শেখানো হয় যে দেশপ্রেম লজ্জাজনক, তবে সামরিক বাহিনীর কার্যকারিতা কমে যাবে। যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি।
শুধু আমেরিকা নয়, এই একই প্যাটার্ন ইউরোপ এবং ভারতের রাজনীতিতেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভারতের বিজেপি সরকারের অধীনে জাতীয়তাবাদের উত্থানের পর বামপন্থী ও ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো এক কাতারে চলে এসেছে। তারা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে, যা রাজনীতির সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে।
তারা একাডেমিক এবং আইনি কাঠামোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। ইসলামবাদ বা চরম বামপন্থা নিয়ে কোনো সমালোচনা করলেই তারা তাকে ‘হেট স্পিচ’ বা ঘৃণ্য বক্তব্য বলে দেয়। এতে সাধারণ এবং সত্যিকার অর্থেই সেক্যুলার সংস্কারকদের কণ্ঠস্বর কার্যত স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। এটি তাদের এক শক্তিশালী কৌশলে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় এবং এনজিওগুলোতে তারা কৌশলে নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে। তারা ‘ইন্টারসেকশনালিটি’ বা সংযোগবাদের নামে মুসলিম, ফিলিস্তিনি এবং শরণার্থীদের সংখ্যালঘু হিসেবে একই কাতারে ফেলছে। ফলে বৈচিত্র্যের নামে উগ্র ইসলামপন্থী বক্তাদের প্লাটফর্ম দেওয়া হচ্ছে, যা আগে কখনো ভাবা যায়নি।
ফলাফল কী হচ্ছে? ইহুদিবিদ্বেষকে প্রগতিশীল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতির মোড়কে নতুনভাবে পরিবেশন করা হচ্ছে। ফলে সহিংসতা এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতির পথ সুগম হচ্ছে। সাংবিধানিক মূল্যবোধ হারিয়ে সেখানে জায়গা করে নিচ্ছে গোষ্ঠীভিত্তিক আনুগত্য। যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় ঐক্যের জন্য বড় সংকট তৈরি করছে।
এই জোটের শুরুটা হয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, এরপর তা সংবাদমাধ্যম ও এনজিওতে ছড়িয়ে পড়ে। প্রগতিশীল এনজিও, বামপন্থী শিক্ষক এবং মুসলিম ছাত্র সংগঠনগুলো এখন একই তহবিল এবং আইনি সহায়তা ভাগ করে নেয়। ফলে যে কোনো প্রতিবাদ এখন রাজনৈতিক এজেন্ডায় পরিণত হয়, যা দেশের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করছে।
ইউরোপেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। লেবার বা গ্রিন পার্টির মতো বাম দলগুলো মুসলিম কমিউনিটির সাথে সমন্বয় করছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বলছে, জিহাদি নেটওয়ার্কগুলো এই জলবায়ু বা ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনের আড়ালে নিজেদের প্রভাব বাড়াচ্ছে। এটি তাদের মূলধারার রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের একটি সহজ মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতে বিষয়টি আরও জটিল। ২০১৯ সাল থেকে সিএএ-এনআরসি, কাশ্মীর ইস্যু বা অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি অ্যাকশন—সব কিছুতেই বাম এবং ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো সমন্বয় করছে। তারা স্থানীয় ইস্যুগুলোকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ইস্যুতে রূপান্তর করছে, যা দেশের বৈদেশিক নীতি এবং নিরাপত্তার জন্য বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
শেষে, এই জোটটি কি স্থিতিশীল? বিশেষজ্ঞরাও একে ‘কৌতুকপূর্ণ’ এবং ‘অস্থির’ বলছেন। বামপন্থীরা সেক্যুলারিজম চায়, আর ইসলামপন্থীরা শরীয়াহ আইন। তাদের আদর্শিক ভিন্নতা থাকলেও আপাতত তারা অভিন্ন শত্রু দমনে ঐক্যবদ্ধ। আর লগারির সেই সতর্কবার্তা মনে রাখা প্রয়োজন—পরের প্রজন্ম কি এমন দেশ পাবে, যা তারা নিজেই চিনবে না?
আমেরিকা, ইউরোপ কিম্বা ভারত—যে দেশই হোক, এই আদর্শিক লড়াই এখন আর লুকানো নেই। রেড-গ্রিন জোটের এই প্রভাব নিয়ে আমাদের খোলাখুলি বিতর্ক করা প্রয়োজন। আপনারা কী মনে করেন? এই জোট কি সত্যিই বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি? নিচে কমেন্ট করে জানান আপনার মতামত।