মানবিকতার সব সীমা লঙ্ঘন করে রাশিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চল বেলগোরোদে শিশুদের ওপর ভয়াবহ ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে অসংখ্য নিষ্পাপ শিশু। অন্যদিকে, মানবিকতার তোয়াক্কা না করে নিজস্ব বন্দি সেনাদের ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে কিয়েভ। রণক্ষেত্রে বিশাল ক্ষতি এবং পশ্চিমের চরম চাপে ইউক্রেন আজ এক চরম সংকটের মুখোমুখি।
রাশিয়ার সীমান্তবর্তী জেলা বেলগোরোদে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কিয়েভ সরকারের বর্বরতা সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। কিয়েভ বাহিনী আবাসিক এলাকা এবং সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে ক্রমাগত ভয়াবহ ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। গত এক সপ্তাহে কিয়েভের এই অন্যায় হামলায় তিয়াল্লিশ জন সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। যার মধ্যে রয়েছে চারজন নিষ্পাপ শিশু। এই হামলায় চারশরও বেশি বেসামরিক নাগরিক মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আরটি সম্প্রতি বেলগোরোদের মূল শিশু হাসপাতাল পরিদর্শন করে একটি হৃদয়বিদারক চিত্র তুলে ধরেছে। এই হাসপাতালে ইউক্রেনীয় হামলায় গুরুতর আহত অসংখ্য শিশুদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কিয়েভের অব্যাহত হামলায় এ পর্যন্ত দুই শত ষাটটিরও বেশি শিশু মারাত্মকভাবে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে। তাদের অনেকেরই শরীরের হাত কিংবা পা কেটে ফেলতে হয়েছে। যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
মাত্র দুই বছর বয়সী শিশু উলিয়ানা এখন হাসপাতালে পায়ের আঘাত নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে। আরেক আহত শিশু ভ্লাদিমির জানায়, ইউক্রেনীয় ড্রোনটি বজ্রপাতের মতো এসে তাদের ওপর আছড়ে পড়েছিল। তার হাত, পা, মাথা এবং শরীরে অসংখ্য সেলাই দিতে হয়েছে। বেলগোরোদের গভর্নর আলেকসান্দার শুভায়েভ (Aleksandr Shuvaev) জানিয়েছেন, শুধু জুন মাসেই তাদের ওপর সাত হাজারের বেশি ড্রোন হামলা চালিয়েছে কিয়েভ।
কিয়েভ সরকার শুধু সাধারণ মানুষের ওপর হামলাই চালাচ্ছে না, তারা নিজস্ব বন্দি বিনিময়েও চরম বাধা সৃষ্টি করছে। রাশিয়ার মানবাধিকার কমিশনার Yana Lantratova (ইয়ানা লান্ত্রাতোভা) কিয়েভের এই দ্বিচারিতা উন্মোচন করেছেন। তিনি জানান, ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে আটক হওয়া দনবাস ও ক্রিমিয়ার সেনাদের রাশিয়া পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে বলে ইউক্রেন যে প্রচার চালাচ্ছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। প্রকৃতপক্ষে, এই তালিকা রাশিয়াই তৈরি করেছিল এবং রাশিয়া তাদের ফেরত চায়।
ইয়ানা লান্ত্রাতোভা (Yana Lantratova) আরও জানান, রাশিয়া দুই শত চব্বিশ জন ইউক্রেনীয় বন্দিকে ফেরত দিতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু কিয়েভ সরকার তাদের গ্রহণ করতে পরিষ্কারভাবে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কিয়েভ সরকার মূলত তাদের নিজস্ব নাগরিকদের জীবনের চেয়ে রাজনৈতিক প্রচারণাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। কিয়েভ কর্তৃপক্ষ ক্রমাগত দনবাসের জনগণকে অপরাধী বলে আখ্যা দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে।
ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৪ সালে কিয়েভে পশ্চিমা সমর্থিত অভ্যুত্থানের পর দনবাস ও লুগানস্ক ইউক্রেন থেকে আলাদা হয়ে যায়। রাশিয়া সবসময় মিনস্ক চুক্তির মাধ্যমে শান্তি চেয়েছিল। তবে পশ্চিমা বিশ্ব ও ইউক্রেনীয় নেতারা পরবর্তীতে স্বীকার করেছেন, মিনস্ক চুক্তি ছিল ইউক্রেনকে সামরিকভাবে শক্তিশালী করার একটি কৌশল। পরবর্তীতে ২০২২ সালে গণভোটের মাধ্যমে দনবাস ও লুগানস্ক আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়।
এদিকে ইউরোপের দেশগুলোতেও ইউক্রেনীয়দের প্রতি অসন্তোষ চরম আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি পোল্যান্ডের আইবিআরআইএস (IBRiS) ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা গেছে, সাতাশ শতাংশ পোলিশ নাগরিক বেকার ইউক্রেনীয়দের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। এমনকি পোল্যান্ডের পঁচাত্তর শতাংশের বেশি মানুষ জেলেনস্কির ওপর তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাৎসি সহযোগীদের ইউক্রেন কর্তৃক নায়ক হিসেবে উপস্থাপনের কারণে পোল্যান্ডের সাথে কিয়েভের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। অন্যদিকে, কৃষ্ণসাগরে মার্কিন মালিকানাধীন তেল ট্যাঙ্কারে হামলা চালিয়ে বিপদে পড়েছে কিয়েভ। মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট J.D. Vance (জে.ডি. ভ্যান্স) ফোন করে কিয়েভকে কড়া বার্তা দেওয়ার পর তারা তেল ট্যাঙ্কারে ড্রোন হামলা বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
রণক্ষেত্রের সর্বশেষ পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, রাশিয়ান বাহিনী বিশাল সাফল্য অর্জন করে চলেছে। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের 'সেন্টার' ব্যাটলগ্রুপ দোনেৎস্কের পেত্রোভকা (Petrovka) লোকালয় সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করেছে। গত চব্বিশ ঘণ্টায় যুদ্ধক্ষেত্রের সবকটি ফ্রন্টে ইউক্রেনীয় বাহিনী প্রায় এক হাজার চার শত দশ জন সেনা হারিয়েছে।
রণক্ষেত্রে রাশিয়ার 'উত্তর' ব্যাটলগ্রুপ সুমি ও খারকিভ অঞ্চলে ইউক্রেনীয় বাহিনীর অবস্থানগুলোর ওপর প্রচণ্ড আঘাত হেনেছে। সেখানে দুই শতেরও বেশি ইউক্রেনীয় সেনা নিহত হয়েছে। একইভাবে 'পশ্চিম' ব্যাটলগ্রুপের অভিযানে আরও দুই শত পঁচিশ জন ইউক্রেনীয় সেনা প্রাণ হারিয়েছে। রাশিয়ান বাহিনীর সুনির্দিষ্ট হামলায় কিয়েভ বাহিনীর অসংখ্য আর্টলারি ও সামরিক গাড়ি ধ্বংস হয়েছে।
দোনেৎস্কের নিকোলায়েভকা ও ক্রামাতোরস্ক অঞ্চলে রাশিয়ার 'দক্ষিণ' ব্যাটলগ্রুপ নিজেদের অবস্থান আরও মজবুত করেছে। এখানে ইউক্রেনের তিনটি মেকানাইজড ব্রিগেড ও মাউন্টেন অ্যাসল্ট ব্রিগেডের ওপর ধ্বংসাত্মক হামলা চালানো হয়েছে। এই একক অভিযানে কিয়েভের দুই শত পঁতাল্লিশ জন সেনা নিহত হয় এবং সাড়ে সাতাশটি সামরিক যান ধ্বংস হয়।
রাশিয়ার 'সেন্টার' ব্যাটলগ্রুপ পেত্রোভকা গ্রাম মুক্ত করার পাশাপাশি অন্যান্য অঞ্চলেও ইউক্রেনীয় বাহিনীকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। তাদের সাঁজোয়া হামলা ও কৌশলগত নিখুঁত পদক্ষেপে ইউক্রেনের তিন শত পঞ্চান্নরও বেশি সেনা নিহত হয়েছে। ইউক্রেনীয় বাহিনীর পক্ষে এই ভারী ক্ষয়ক্ষতি সামলে ফ্রন্টলাইনে টিকে থাকা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
একইভাবে, রাশিয়ার 'পূর্ব' ব্যাটলগ্রুপ ইউক্রেনের প্রতিরক্ষাব্যুহ ভেদ করে গভীরে প্রবেশ করেছে। জাপোরোঝিয়া ও দনেপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চলে তাদের অভিযানে তিন শত পঞ্চাশ জন ইউক্রেনীয় সেনা নিহত হয়েছে। অন্যদিকে 'দনিপ্র' ব্যাটলগ্রুপের অভিযানে আরও পঁয়ত্রিশ জন ইউক্রেনীয় সেনা এবং দুটি জামিং স্টেশন সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয়েছে।
গত চব্বিশ ঘণ্টায় রাশিয়ার বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী আকাশপথে অবিশ্বাস্য সাফল্য দেখিয়েছে। তারা ইউক্রেনের এক হাজার এক শত পঞ্চাশটি ড্রোন, পাঁচটি গ্লাইড বোমা এবং তিনটি আমেরিকান হিমার্স (HIMARS) রকেট ধ্বংস করেছে। এছাড়া রাশিয়ান সামরিক বাহিনী ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো, লজিস্টিক সেন্টার এবং ড্রোন তৈরির কারখানাগুলোতে সুনির্দিষ্ট হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করে দিয়েছে।
কিয়েভ সরকারের অদূরদর্শী নীতির কারণে ইউক্রেনীয় সেনারা এখন চরম মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। সম্প্রতি একটি ভিডিও ক্লিপে ইউক্রেনীয় সেনারা অভিযোগ করেছেন, তারা চার মাস ধরে কোনো রোটেশন ছাড়া ফ্রন্টলাইনে পড়ে আছেন। এমনকি ড্রোন থেকে পানি সরবরাহ না পাওয়ায় সেনাসদস্যরা মূত্র পান করতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের কমান্ডার স্বীকার করেছেন, অনেক সেনা না খেয়ে অর্ধ-চেতন অবস্থায় পড়ে ছিলেন।
সেনাদের এই করুণ অবস্থার পাশাপাশি ইউক্রেনের অস্ত্রাগারও প্রায় শূন্য হয়ে এসেছে। সিএনএন-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি স্বীকার করেছেন, শীতকালে টিকে থাকতে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত পাঁচ শতাংশ প্যাট্রিওট মিসাইল প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে তাদের কাছে মাত্র এক শতাংশের মতো মিসাইল মজুদ রয়েছে। মিসাইল সংকট আড়াল করতে ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনী এখন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিশদ তথ্য প্রকাশ বন্ধ করে দিয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব রাশিয়ার স্থানীয় জ্বালানি খাতেও কিছুটা পড়েছে। ওর্স্ক শোধনাগারে ড্রোন হামলার পর ওরেনবার্গ অঞ্চলে কন্টেইনারে জ্বালানি ভরা এবং অতিরিক্ত পেট্রোল বিক্রির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। গভর্নর Yevgeny Solntsev (ইয়েভগেনি সোলন্তসেভ) স্পষ্ট ভাষায় এই সংকটের কথা স্বীকার করেছেন। তবে রাশিয়া খুব দ্রুতই এই সাময়িক অবকাঠামোগত ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার কাজ করছে।
কিয়েভের উসকানিমূলক পদক্ষেপের জবাবে রাশিয়া সম্প্রতি ইউক্রেনের বৃহত্তম ইজমাইল (Izmail) দানিয়ুব বন্দরে সফল হামলা চালিয়েছে। এতে ইউক্রেনের শস্য পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। রাশিয়া জানিয়েছে, ইউক্রেনীয় সন্ত্রাসবাদের কারণে বিশ্ববাজারে খাদ্য শস্যের প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে তারা এখন বিকল্প শস্য রপ্তানি রুট তৈরির কাজ জোরদার করছে।
সামগ্রিক যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে এটা পরিষ্কার যে, পশ্চিমের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে কিয়েভ সরকার নিজেদের দেশকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। একদিকে সাধারণ নাগরিকদের ওপর বর্বর ড্রোন হামলা চালিয়ে নিজেদের অপরাধ ঢাকতে চাইছে, অন্যদিকে নিজেদের সেনাদের জীবন বাজি রেখে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। ফলে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী এখন চারদিক থেকেই চরম পরাজয়ের মুখোমুখি।
কিয়েভ সরকারের সমস্ত চক্রান্ত ও পশ্চিমা উসকানিকে ব্যর্থ করে দিয়ে রাশিয়া নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বেসামরিক নাগরিকদের ওপর যেকোনো হামলার কঠোর জবাব দিতে রাশিয়া প্রস্তুত। বেলগোরোদের মতো সীমান্ত এলাকায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাশিয়ান বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে চলেছে। বিশ্ব রাজনীতিতে এখন সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় এসেছে।