বাপের জন্মে কেউ কি দেখেছে, নিজের ভাই যখন শত্রুর আঘাতে রক্তাক্ত হয়, তখন অন্য ভাইরা হাত গুটিয়ে তামাশা দেখে? অথচ আজ ইরানের সাথে ঠিক তাই ঘটছে! একদিকে আমেরিকা-ইসরায়েলের মতো হায়েনারা ঝাঁপিয়ে পড়ছে, আর অন্যদিকে আমাদের তথাকথিত মুসলিম ভাইরা ঘরে বসে চা খাচ্ছে। কেন এই চরম বিশ্বাসঘাতকতা? আজকের ভিডিওতে পর্দা ফাঁস হবে সেই সব বেইমানির।
কথায় আছে, "ঘরের শত্রু বিভীষণ"। ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি ঠিক এই প্রবাদের মতোই ফুটে উঠেছে। যখন ইরান একাই ইসরায়েল এবং আমেরিকার মতো বিশ্বশক্তিদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মুসলিম উম্মাহর সম্মান রক্ষায় লড়ে যাচ্ছে, তখন মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো পিঠে ছুরি মারছে। এই নীরবতা কেবল রহস্যময় নয়, বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত বিশ্বাসঘাতকতা যা সাম্রাজ্যবাদীদের হাতকেই শক্তিশালী করছে।
বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে আমেরিকা এবং ইসরায়েল নির্লজ্জভাবে ইরানের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এই যুদ্ধ কেবল ইরানের নয়, বরং এটি গোটা অঞ্চলের অস্তিত্বের লড়াই। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, মধ্যপ্রাচ্যের বড় বড় দেশগুলো এই অন্যায় হামলা কেবল চেয়ে চেয়ে দেখছে। তারা একবারও ভাবছে না যে, আজ ইরান আক্রান্ত হলে কাল তাদের পালা আসবে। তারা মূলত পশ্চিমা প্রভুদের সন্তুষ্ট করতেই ব্যস্ত।
মুসলিম প্রধান দেশগুলো মুখে মুখে প্যান-ইসলামিক সংহতির কথা বললেও কাজের বেলায় জিরো। তারা ইরানকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসা তো দূরের কথা, উল্টো দেশটিকে নিজেদের জন্য হুমকি মনে করছে। আসলে তাদের এই ভয় ইরানের শক্তির জন্য নয়, বরং তাদের নিজেদের গদি হারানোর ভয়। তারা জানে ইরান শক্তিশালী হলে তাদের একনায়কতন্ত্র এবং পশ্চিমাদের দালালি করার সুযোগ চিরতরে শেষ হয়ে যাবে।
সাম্রাজ্যবাদীরা সবসময়ই চেয়েছে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে। তারা সফলভাবে সুন্নি-শিয়া বিতর্ককে সামনে এনে আরব দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলেছে। ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞরা বলছে, শিয়াদের সাথে সুন্নিদের সংহতি হতে পারে না—কি অদ্ভুত যুক্তি! যখন ইসলাম ও মুসলমানদের অস্তিত্ব সংকটে, তখন এই ধরণের সাম্প্রদায়িক বিভেদ টেনে আনা কি শত্রুর হাতকে শক্তিশালী করা নয়? আমাদের মনে রাখা উচিত শত্রু সবার এক।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নিজেকে মজলুমের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করেছে। তারা চায় একটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম ইসলামী ব্লক তৈরি করতে। অথচ এই লক্ষ্যকেই আরব দেশগুলো তাদের নিজেদের অস্তিত্বের জন্য ঝুঁকি মনে করছে। বিশেষ করে রমজান মাসে যখন হামলা হচ্ছে, তখন ইরানকে দোষারোপ করা হচ্ছে। কিন্তু কেউ দেখছে না যে বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিনিদের জন্য ইরান কী ত্যাগ স্বীকার করেছে।
ইরান যখন নিজের সুরক্ষার জন্য পারমাণবিক শক্তি অর্জনের চেষ্টা করছে, তখন ইসরায়েল আর আমেরিকার ঘুম হারাম হয়ে গেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সৌদি আরব বা অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোও এতে আতঙ্কিত। তারা মনে করছে ইরান শক্তিশালী হলে তাদের আধিপত্য কমবে। অথচ একটি শক্তিশালী মুসলিম রাষ্ট্র থাকলে যে গোটা মুসলিম বিশ্বের মর্যাদা বাড়ত, সেই সহজ সত্যটি তারা ক্ষমতার লোভে ভুলে বসে আছে।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই ইরানকে কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে। তৎকালীন শাহ শাসনামলে আরবরা ইরানের বন্ধু ছিল, কারণ তখন ইরান ছিল আমেরিকার পুতুল। যেই ইরান স্বাধীন হতে চাইল, অমনি তারা শত্রু হয়ে গেল। আরব রাজতন্ত্রগুলো ভয় পায় যে ইরানের মতো বিপ্লব যদি তাদের দেশেও শুরু হয়, তবে তাদের রাজপ্রাসাদ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো আগে থেকেই ওয়াশিংটনের সাথে গভীর প্রেম বজায় রেখে চলছে। তাদের অর্থনীতি, নিরাপত্তা এমনকি জীবনযাত্রাও এখন পশ্চিমাদের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতাই তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। ফলে তারা যখন দেখে আমেরিকা ইরানকে আক্রমণ করছে, তখন তারা প্রতিবাদের সাহস পায় না। তারা মূলত নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ইসলামের মূল চেতনাকে বিকিয়ে দিচ্ছে।
ইরান গত কয়েক দশক ধরে লেবানন, সিরিয়া এবং ইয়েমেনে যে 'প্রতিরোধের অক্ষ' গড়ে তুলেছে, তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলি আগ্রাসন ঠেকানো। হামাস এবং ইসলামিক জিহাদকে সমর্থনের মাধ্যমে তারা প্রমাণ করেছে যে ফিলিস্তিনিদের প্রকৃত বন্ধু ইরানই। অন্য দেশগুলো যখন শুধু লম্বা লম্বা বিবৃতি দেয়, ইরান তখন অস্ত্র আর অর্থ দিয়ে সাহায্য করে। অথচ একেই বলা হচ্ছে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা!
সবচেয়ে বড় কলঙ্কজনক অধ্যায় হলো আব্রাহাম অ্যাকর্ডস। আরব আমিরাত এবং বাহরাইনের মতো দেশগুলো যখন ইসরায়েলের সাথে হাত মেলায়, তখন ফিলিস্তিনিদের রক্তের সাথে বেঈমানি করা হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে ইরানকে সবার সাধারণ শত্রু হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। অর্থাৎ যারা ইসলামের শত্রুকে বন্ধু বানায়, তারা ইরানের মতো দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রকে শত্রু বলবে—এটাই তো স্বাভাবিক।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ইসরায়েল পঙ্গু করে দিচ্ছে ফিলিস্তিনকে, দুর্বল করার চেষ্টা করছে হিজবুল্লাহকে। এই অবস্থায় ইরানের পাশে দাঁড়ানো ছিল সবার ঈমানি দায়িত্ব। কিন্তু উল্টো দেখা যাচ্ছে সৌদি আরব ইসরায়েলের আরও কাছাকাছি যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। তারা আয়রন ডোম প্রযুক্তি পেতে চায়, অথচ নিজেদের ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত হাতকে ধুতে চায় না। এই নীতি মুসলিম বিশ্বকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে যাচ্ছে।
যতই ষড়যন্ত্র হোক না কেন, ইরান প্রমাণ করেছে যে তারা মাথানত করার জাতি নয়। ইতিহাস সাক্ষী দেবে, যখন গোটা বিশ্ব ইরানের বিরুদ্ধে ছিল, তখন তারা একাই সত্যের পথে অবিচল ছিল। বেইমান আরব শাসকরা হয়তো সাময়িকভাবে টিকে থাকবে, কিন্তু ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে তাদের ঠাঁই হবে। ইরান লড়ছে, লড়বে এবং ইনশাআল্লাহ বিজয়ী হবে। কারণ সত্যকে কখনোই বেশিদিন চেপে রাখা যায় না।
