বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে ডোপ টেস্ট নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে সম্প্রতি স্বর্ণজয়ী ভারোত্তোলক Mabia Akter Simanta-এর ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়ে নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশের ক্রীড়া চিকিৎসা ব্যবস্থা ও অ্যাথলেটদের সচেতনতা।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের কোনো ক্রীড়াবিদ আগে কখনো ডোপ টেস্টে পজিটিভ হননি বলে দাবি রয়েছে। তাই এই ঘটনা ক্রীড়াঙ্গনে তৈরি করেছে বড় ধরনের প্রশ্ন ও বিতর্ক।

দেশের ক্রীড়াঙ্গনের দুই পরিচিত চিকিৎসক দেবাশীষ চৌধুরী ও অধ্যাপক Imranur Rahman দীর্ঘদিন ধরে ক্রীড়াবিদদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছেন। স্পোর্টস মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ইমরানুর রহমান ডোপ টেস্ট প্রক্রিয়া নিয়ে বলেন, এটি পুরোপুরি আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হয়।

তিনি জানান, “একসঙ্গে দুইটি স্যাম্পল নেওয়া হয়। একটি পজিটিভ হলে আরেকটি পরীক্ষা করা হয়। বিশ্বজুড়ে WADA অনুমোদিত ২০টির বেশি ল্যাব রয়েছে, সেখানেই পরীক্ষা হয়। তাই ফলাফল নিয়ে সন্দেহের সুযোগ নেই।”

একই মত পোষণ করেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের চিকিৎসক দেবাশীষ চৌধুরীও। তিনি বলেন, “WADA ডোপ টেস্ট খুবই নির্ভরযোগ্য। পুরো প্রক্রিয়াই স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ।”

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আইসিসি নিয়মিত ডোপ টেস্ট পরিচালনা করে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডও বিভিন্ন টুর্নামেন্টে নিয়মিত পরীক্ষা করে থাকে। এমনকি জাতীয় ক্রিকেট লিগে আগে একজন ক্রিকেটার ডোপ টেস্টে পজিটিভও হয়েছিলেন, যার শাস্তি আসে WADA থেকেই।

তবে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে এখনো নিয়মিত ডোপ টেস্ট চালু হয়নি। চিকিৎসক দেবাশীষ চৌধুরী জানান, “একটি টেস্টে ৬০০–৭০০ ডলার খরচ হয়। বিসিবি সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতি বছর কিছু নির্দিষ্ট টুর্নামেন্টে এটি করে থাকে।”

স্প্রিন্ট, ভারোত্তোলন ও সাঁতার—এই ধরনের খেলায় ডোপ পজিটিভের ঘটনা বিশ্বব্যাপী বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশেও এসব খেলায় পরীক্ষা তুলনামূলক কম হয় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

দীর্ঘদিন ধরে অ্যান্টি-ডোপিং নিয়ে কাজ করা চিকিৎসক শফিকুর রহমান বলেন, ব্যয়বহুল হওয়ায় সব খেলায় নিয়মিত পরীক্ষা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশ গেমস ও যুব গেমসে মাঝে মাঝে এটি করা হয়, তবে ফেডারেশনভিত্তিক কার্যক্রম সীমিত।

সাবেক জাতীয় বক্সিং চ্যাম্পিয়ন সুর কৃষ্ণ চাকমা মনে করেন, অ্যাথলেটদের সচেতনতা বাড়াতে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। তার মতে, শুধু সেমিনার বা ক্লাস যথেষ্ট নয়।

এদিকে মাবিয়ার ঘটনায় আরও বড় প্রশ্ন উঠেছে—তিনি যে ওষুধ সেবন করেছিলেন, তা কি অনুমোদিত ছিল? চিকিৎসকের পরামর্শে নেওয়া সেই ওষুধ সম্পর্কে অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন অবগত ছিল কি না, তা নিয়েও রয়েছে মতভেদ।

যদিও নানা বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় নিশ্চিত—তার শরীরে নিষিদ্ধ উপাদান পাওয়া গেছে এবং আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী তাকে দায় নিতে হবে।

WADA প্রতি বছর জানুয়ারিতে নিষিদ্ধ ওষুধের তালিকা প্রকাশ করে। কিন্তু অনেক অ্যাথলেটই সেই তালিকা বা সংশ্লিষ্ট অ্যাপ সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সুর কৃষ্ণ চাকমা বলেন, “অনেকেই WADA অ্যাপ ব্যবহারই করেন না। আবার কেউ জানলেও নিয়মিত চেক করেন না।”

খাবার ও সাপ্লিমেন্ট থেকেও অনেক সময় ডোপ পজিটিভ হওয়ার ঝুঁকি থাকে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে অনেক অ্যাথলেট ভয় বা অজ্ঞতার কারণে অনুমোদিত সাপ্লিমেন্টও ব্যবহার করেন না, যা পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন—এই ঘটনায় কি ক্রীড়া প্রশাসন আরও গভীর তদন্ত করবে? বিশেষ করে চিকিৎসা অনুমোদন ও ওষুধ ব্যবহারের প্রক্রিয়া কতটা সঠিক ছিল, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠছে।

ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শুধু শাস্তি নয়, পুরো সিস্টেমকে আরও শক্তিশালী করাই এখন সময়ের দাবি।

ডোপ টেস্ট পজিটিভ হলে খেলোয়াড় আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া—দুই স্তরের খেলাই থেকে নিষিদ্ধ হন। এর উদ্দেশ্য একটাই—খেলার নৈতিকতা ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা।

 

news