১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক সবসময়ই ছিল টানাপোড়েনের। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ছবিটা পাল্টাচ্ছে। পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের ঢাকা সফরের পর দুই দেশের সম্পর্কে নতুন উষ্ণতা দেখা দিয়েছে। আর এটিই ভারতের জন্য তৈরি করেছে নতুন কৌশলগত দুশ্চিন্তা।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়ছে। এর মধ্যেই পূর্ব সীমান্তে বাংলাদেশ-পাকিস্তান ঘনিষ্ঠতা ভারতকে আরও চিন্তায় ফেলেছে। সাংবাদিক দেবর্ষী দাশগুপ্ত অনলাইন স্ট্রেইট টাইমসের এক প্রতিবেদনে লিখেছেন—অতীতের কারণে ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক দীর্ঘদিন বৈরিতায় ভরা থাকলেও শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দ্রুত পরিবর্তন আসছে।
গত ২৪ আগস্ট ইসহাক দার ঢাকায় আসেন দুই দিনের সফরে। ১৩ বছর পর কোনো উচ্চপর্যায়ের পাকিস্তানি নেতা এ সফর করলেন। তিনি বাংলাদেশের জন্য ৬০০টি বৃত্তি এবং আহতদের জন্য কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপনের প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয় কূটনীতিকদের ভিসামুক্ত ভ্রমণ, বাণিজ্য বৃদ্ধির জন্য যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন, টেক্সটাইল ও কৃষি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো নিয়ে।
পাকিস্তান আবারও সরাসরি বিমান চালুর পরিকল্পনা করছে, যা ২০১৮ সাল থেকে বন্ধ ছিল। এরই মধ্যে চট্টগ্রামে পাকিস্তানি জাহাজ ভিড়েছে—১৯৭১ সালের পর এটি প্রথম সমুদ্র যোগাযোগ। পাকিস্তানি বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ এখন পাকিস্তানের দিকে হাত বাড়াচ্ছে, যদিও ১৯৭১ সালের যুদ্ধের দায় ও ক্ষমাপ্রার্থনা না করা এখনো বড় বাধা।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুধু পাকিস্তানের সঙ্গেই নয়, চীনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। মার্চে তার প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে বেইজিং বাংলাদেশকে ২.১ বিলিয়ন ডলার ঋণ, অনুদান ও বিনিয়োগ দেয়। মংলা বন্দর আধুনিকায়নে চীন দিচ্ছে ৪০০ মিলিয়ন ডলার। পাকিস্তান-বাংলাদেশ-চীন ত্রিমুখী ঘনিষ্ঠতা ভারতকে স্বাভাবিকভাবেই কৌশলগতভাবে চাপে ফেলছে।
বাংলাদেশ জানিয়েছে, যুদ্ধাপরাধ, আটকে থাকা সম্পদ বা আটকে পড়া পাকিস্তানিদের মতো ঐতিহাসিক বিষয়গুলো সম্পর্কের পথে বাধা হবে না। তারা সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে চায়। কিন্তু ভারতের মধ্যে শঙ্কা—বর্তমান ঢাকা প্রশাসন ‘ভারতবিরোধী’ হয়ে উঠছে। কারণ শেখ হাসিনা এখন ভারতে আশ্রয়ে আছেন, আর বাংলাদেশ অভিযোগ করছে ভারত থেকে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
অন্যদিকে ভারত উদ্বিগ্ন বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়েও। গত এক বছরে ভিসা ও বাণিজ্যে বিধিনিষেধও বেড়েছে। শোনা যাচ্ছে, বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াচ্ছে এবং চীন থেকে ১২টি জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা করছে। ভারত অপেক্ষায় আছে ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর নতুন সরকার এলে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সুযোগে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন—ভারতের এখনই মানবিক কারণে ভিসা সুবিধা বাড়ানো উচিত এবং একইসঙ্গে কড়া বার্তাও দেওয়া দরকার, যাতে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে কোনো দেশ ভারতের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করতে না পারে।
