চমক! ঐতিহ্যবাহী লেবানিজ নেতৃত্ব বাদ দিয়ে এবার সরাসরি আইআরজিসি কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে হিজবুল্লাহ, ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় প্রস্তুতি তুঙ্গে

লেবাননের প্রতিরোধযোদ্ধাদের সংগঠন হিজবুল্লাহকে এতদিন পেছন থেকে সমর্থন দিলেও এবার পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইরান। এখন থেকে গ্রুপটি পরিচালনা করবেন দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কর্মকর্তারা। আরব সংবাদমাধ্যমগুলোর শনিবারের (২১ ফেব্রুয়ারি) রিপোর্ট অনুযায়ী, হিজবুল্লাহ বর্তমানে তাদের ঐতিহ্যবাহী লেবানিজ নেতৃত্বের পরিবর্তে ইরানের আইআরজিসি কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।

ইসরাইলি বা আমেরিকান হামলার আশঙ্কায়, সম্প্রতি লেবাননে আসা আইআরজিসি কর্মকর্তাদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে হিজবুল্লাহ তাদের সামরিক ও নিরাপত্তা প্রস্তুতি উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করেছে। সৌদি আরবের একাধিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই কর্মকর্তারা শুধু হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের তদারকিই করছেন না, বরং সরাসরি কৌশলগত যুদ্ধ পরিকল্পনাও পরিচালনা ও বাস্তবায়ন করছেন।

হিজবুল্লাহ–ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে আল-আরাবিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, আইআরজিসির কয়েকজন কর্মকর্তা সম্প্রতি ইরান থেকে লেবাননে গেছেন। তাদের কাজ হচ্ছে হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করা। ইসরাইলের সঙ্গে ১৪ মাসের লড়াইয়ে এই সক্ষমতা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতির মধ্য দিয়ে সেই লড়াই শেষ হয়।

সূত্রগুলো জানায়, ইরানি কর্মকর্তারা লেবাননজুড়ে হিজবুল্লাহ সদস্যদের সরাসরি ব্রিফিং দিচ্ছেন। তারা আরও বলেন, লেবাননের বেকা উপত্যকার একটি স্থানে আইআরজিসির কর্মকর্তারা হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটের সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। স্থানটি শুক্রবার রাতে ইসরাইলি বোমাবর্ষণের শিকার হয়।

ধারাবাহিক বিমান হামলায় অন্তত ৫০ জন আহত এবং ১২ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে হিজবুল্লাহর তিনজন কমান্ডার—আলি জায়েদ আল-মুসাভি, মুহাম্মদ ইব্রাহিম আল-মুসাভি ও হুসাইন ইয়াগি—ছিলেন। ইসরাইলি বাহিনী জানায়, হামলায় হামাস ও হিজবুল্লাহর কমান্ড সেন্টার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। হিজবুল্লাহ–ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর মতে, লেবাননের বিরুদ্ধে বড় ধরনের ইসরাইলি সামরিক অভিযান কেবল সময়ের ব্যাপার।

এই প্রতিবেদন এমন এক সময়ে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ অঞ্চলে সামরিক শক্তি বাড়িয়েছেন। তিনি বারবার ইরানে হামলার হুমকি দিচ্ছেন। প্রথমে গত মাসে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে ইরানের কঠোর পদক্ষেপের কারণে তিনি হুমকি দেন। পরে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও একই ধরনের হুমকি দেন। ট্রাম্প ইরানকে পরমাণু কর্মসূচি ও ব্যালিস্টিক মিসাইল ইস্যুতে নতুন চুক্তিতে আসার জন্য মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দিয়েছেন।

ইসরাইলি গণমাধ্যমগুলো জানায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে হামলা চালায়, তাহলে ইরান ইসরাইলকেও লক্ষ্যবস্তু করবে—এমন ধারণা থেকে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের পাশে থেকে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কেএএন–কান শনিবার সন্ধ্যায় জানায়, ইরানে হামলার জবাবে হিজবুল্লাহ ইসরাইলে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন লক্ষণ তেল আবিব শনাক্ত করেছে। বিশেষ করে তাদের রকেট বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে।

ধারণা করা হচ্ছে, ইরানে হামলা হলে হিজবুল্লাহ, আইআরজিসি, ইরান–সমর্থিত ইরাকি শিয়া মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা একযোগে ইসরাইলকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।

অন্যদিকে, লেবাননের রাজনৈতিক নেতারা দেশটির ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক উত্তেজনায় ভূমিকা নিয়ে উদ্বিগ্ন। প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিরা নিরপেক্ষতার আহ্বান জানিয়ে সরকারকে হিজবুল্লাহকে লেবাননকে বৃহত্তর সংঘাতে টেনে নেওয়া থেকে বিরত রাখতে চাপ দিচ্ছেন। লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ইসরাইলি বিমান হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এবং সতর্ক করে দিয়েছেন যে লেবাননের সংঘাতে জড়ানো দেশটির জন্য ধ্বংসাত্মক পরিণতি বয়ে আনবে।

ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ) মূল্যায়ন করেছে যে হিজবুল্লাহ সম্ভাব্য সংঘাতে অংশ নিতে পারে যদি গোষ্ঠীটি মনে করে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল ইসলামি শাসন ব্যবস্থাকে উৎখাত করার লক্ষ্য নিয়েছে। ভেলায়েত-ই ফকিহ (ইসলামি আইনবিদের অভিভাবকত্ব) লেবাননের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ভিত্তিগত মতাদর্শে রয়েছে, যা এটিকে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রতি অনুগত করে এবং গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডে তার অবস্থানকে কর্তৃত্বপূর্ণ করে তোলে।

 

news