বাংলাদেশ, যাকে বলা হয় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক প্রস্তুতকারী দেশ। এই শিল্প বিশ্বব্যাপী ফ্রান্সের ক্যারফোর, জাপানের ইউনিক্লো, সুইডেনের এইচএন্ডএম, স্পেনের জারা এবং আরও অনেক বড় ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক সরবরাহ করে।
গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরকার পতনের বিপ্লবের সময় এই শিল্প ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আগস্ট মাসে সংঘটিত সেই অস্থিরতায় দীর্ঘকালীন শাসক শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। এর পর থেকেই শ্রমিকরা ভালো পরিবেশ ও অধিক বেতনের দাবিতে বারবার বিক্ষোভে নেমেছে।
বিজিএমইএ’র দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই অস্থিরতার কারণে শিল্পটি ৪০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়ে। শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং হাজার হাজার শ্রমিক চাকরি হারায়। তবে, সেপ্টেম্বরে পাঁচ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকে খাতটি আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে।
স্নোটেক্স কোম্পানির প্রধান এস.এম. খালেদ বলেন, “আমরা ভালো করছি। আমি কমপক্ষে ১৫টি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সাথে কাজ করছি। আমাদের পণ্য এখন ৫০টি দেশে পাওয়া যাচ্ছে। বিপ্লব-পরবর্তী অস্থিরতার ধাক্কা সামলে শিল্পটি এখন পুরোদমে কাজ করছে।”
গত বছর পোশাক শিল্পে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল ৩৬ বিলিয়ন ডলার, যা তার আগের বছরের ৩৮ বিলিয়ন ডলার থেকে সামান্য কম। বিজিএমইএ’র প্রশাসক আনোয়ার হোসেন জানান, জুলাই-ডিসেম্বর মাসে এই শিল্পে ১৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
তবে শ্রমিকদের জন্য পরিস্থিতি এখনও খুব বেশি বদলায়নি। পোশাক কারখানার শ্রমিক খাতুন বলেন, “মজুরি সামান্য বেড়েছে, তবে তা চাহিদার তুলনায় কিছুই নয়। ওভারটাইম করে মাসে ১৪০ ডলার আয় করি, যা পরিবারের জন্য যথেষ্ট নয়। কারখানার ভেতরে সুবিধা থাকলেও আমাদের বিরতির সময় খুব কম।”
শ্রমিক অধিকার সংগঠন বিজিডব্লিউএস-এর তাসলিমা আক্তার বলেন, “শ্রমিকরা এখনও ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান বজায় রাখতে লড়াই করছে। মালিকদের উচিত আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সাথে ভালোভাবে দরকষাকষি করা।”
পোশাক মালিকরা মনে করছেন, এই শিল্পের সাফল্য ধরে রাখা সম্ভব, তবে এর ভঙ্গুরতাও স্পষ্ট। বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক আবদুল্লাহ হিল রাকিব বলেন, “আমরা যে স্থিতিশীলতা দেখছি তা কেবল উপরিভাগে। শিল্পটি চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়, এবং শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে মালিকদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।”
বিশ্বের পোশাক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও উৎপাদন বাড়ছে, তবে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা কম দামে পণ্য কিনতে চায়, যা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প পুনরুজ্জীবিত হওয়ার খবর আশাব্যঞ্জক। তবে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করা এই শিল্পের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে মালিক, শ্রমিক এবং ক্রেতাদের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর।


