ভাবুন তো, যে আরবরা আমেরিকায় ট্রিলিয়ন ডলার ঢালতো, তারাই যদি আজ হাত গুটিয়ে নেয়? মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন কি তবে বাইডেন-ট্রাম্পের পকেট পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে? ইরানের এক হুংকারে কাঁপছে হোয়াইট হাউস! আজ জানাবো কীভাবে একটি মাত্র নৌপথ আটকে দিয়ে ইরান বদলে দিল পুরো দাবার চাল।

কথায় আছে, "ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়।" মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি ঠিক তেমনই দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিনের মিত্র আমেরিকা আর ইসরায়েলের হয়ে লড়তে গিয়ে আরব দেশগুলো এখন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার চিন্তায় বিভোর। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সপ্তম দিনে এসে পাশার দান এমনভাবে উল্টে গেছে যা খোদ পেন্টাগনও কল্পনা করেনি। আরব দেশগুলো এখন আমেরিকাকে উল্টো বড়সড় এক ধাক্কা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বিখ্যাত ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক রিপোর্টে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। এতদিন সৌদি আরব, কাতার বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো ধনী দেশগুলো আমেরিকার পরম বন্ধু ছিল। তারা মার্কিন অর্থনীতিতে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে ইরানের অনবরত মিসাইল হামলা আর ড্রোন বৃষ্টির মুখে পড়ে সেই সব হিসেবনিকেশ এখন মুহূর্তেই ধূলিসাৎ হতে চলেছে বলে জানা যাচ্ছে।

ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের পবিত্র মুসলিম ভূমি ব্যবহার করে আমেরিকার কোনো সেনা ছাউনি বা মোসাদকে সহযোগিতা করা যাবে না। যদি কোনো আরব দেশ ইসরায়েলকে সাহায্য করে, তবে তাদের ওপরও হামলা চালানো হবে। এই হুমকির পর আরব শেখরা প্রথমে পাত্তা না দিলেও, এখন তারা বেশ নড়েচড়ে বসেছেন। কারণ ইরানের হাতে এখন এমন দুটি চাবিকাঠি রয়েছে যা ধ্বংস করতে পারে যেকোনো অর্থনীতি।

প্রথমত, ইরান ড্রোনের মাধ্যমে হামলা চালাচ্ছে আর দ্বিতীয়ত, তারা বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রপ্তানি পথ 'হরমুজ প্রণালী' কার্যত আটকে দিয়েছে। বর্তমানে এই কৌশলগত পয়েন্টে ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ফলে আরব দেশগুলোর প্রধান আয়ের উৎস তেল রপ্তানি এখন বড় হুমকির মুখে। তেলের বাজার পড়ে গেলে বা রপ্তানি বন্ধ হলে আরব দেশগুলোর অর্থনীতির বারোটা বেজে যাবে, যা তারা মোটেও চায় না।

ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস বলছে, এই সংঘাতের প্রভাবে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে তাদের করা বিশাল বিনিয়োগ পুনর্বিবেচনা করছে। বর্তমানে মার্কিন ট্রেজারি বন্ডে সৌদি আরবের ১৪৫ বিলিয়ন, আমিরাতের ১০০ বিলিয়ন এবং কুয়েতের ৫১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ রয়েছে। এছাড়া আগামী দশ বছরে ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের যে বিনিয়োগের কথা ছিল, তা এখন পুরোপুরি অনিশ্চিত। এই অর্থ তুলে নিলে মার্কিন অর্থনীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।

প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আরব কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুদ্ধ অর্থনীতির এই ভয়াবহ চাপ সামলাতে তারা মোটেও প্রস্তুত নন। তাই তারা বিদেশে করা চুক্তিগুলো নতুন করে মূল্যায়ন করছেন। শুক্রবার প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার ফলে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা আরব দেশগুলোর জাতীয় বাজেটের ওপর অস্বাভাবিক চাপ তৈরি করছে। এর ফলে তারা এখন নিজেদের অর্থ নিজেদের কাছে রাখতেই বেশি আগ্রহী।

উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক শক্তি দুটি পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে। প্রথমটি হলো তাদের নিরাপদ শহরগুলোকে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। দ্বিতীয়টি হলো তেল বিক্রি থেকে আসা অবিরাম অর্থ। কিন্তু ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে এই দুটি ভিত্তিই এখন প্রচণ্ডভাবে কাঁপছে। যদি বিনিয়োগকারীরা মধ্যপ্রাচ্যকে অনিরাপদ মনে করে চলে যেতে শুরু করে, তবে এই আধুনিক শহরগুলো মরুভূমিতে পরিণত হতে খুব বেশি সময় লাগবে না।

পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, কয়েকটি দেশ বর্তমান মার্কিন চুক্তিগুলোতে 'মেজর ফোর্স' বা অনিবার্য পরিস্থিতি ধারা প্রয়োগ করার কথা ভাবছে। এর মানে হলো, যুদ্ধের কারণে তারা আগের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বা চুক্তি রক্ষা করতে বাধ্য থাকবে না। বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তবে শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তা নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির পুরো মানচিত্রটাই চিরতরে বদলে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইসরায়েলকে বাঁচাতে গিয়ে আমেরিকা এখন নিজেদের সবচেয়ে বড় ফিন্যান্সিয়াল সাপোর্টারদের হারাতে বসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই বিশাল অংকের বিনিয়োগ যদি অন্য কোথাও চলে যায়, তবে ডলারের আধিপত্য শেষ হয়ে যাবে। ইরান খুব কৌশলে আমেরিকার এই 'অ্যাকিলিস হিল' বা দুর্বল জায়গায় আঘাত করেছে। আরবরা এখন বুঝতে পারছে, আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে তারা নিজেদের সম্পদ আর শান্তিতে আগুন লাগাতে পারে না।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন যুদ্ধের কালো মেঘের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক মন্দার ভয়। ইরান তার লক্ষ্য অর্জনে সফল হচ্ছে কি না তা সময়ই বলবে, তবে আরব দেশগুলোর এই পিছুটান আমেরিকার জন্য বড় পরাজয় হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে তেল আর ডলারের এই লড়াই কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। যুদ্ধের আগুন শেষ পর্যন্ত কাকে পোড়ায়, সেটাই বড় প্রশ্ন।

news